পর্ব–৯
রিয়া এখন নিজের ভুলগুলো বুঝতে চেষ্টা করছে।
রাত যত গভীর হয়, তার চিন্তাগুলো তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দিনের কোলাহলে, গার্মেন্টসের মেশিনের একঘেয়ে শব্দে, সহকর্মীদের হাসি–ঠাট্টায় কিছুটা সময়ের জন্য সে ভুলে থাকতে পারে। কিন্তু রাত নামলেই সব হিসাব খুলে বসে। বিছানার কোণে শুয়ে, পেটের ওপর হাত রেখে, সে এক এক করে নিজের সিদ্ধান্তগুলোকে বিচার করে।
জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা ছিল—
রিয়া শত্রুর কথা শুনে করেনি,
প্রেমিক বন্ধুর কথা বিশ্বাস করে সবকিছুই করেছিল।
শত্রু কখনও মধুর ভাষায় ধ্বংস ডেকে আনে না। শত্রু আঘাত করলে মানুষ সতর্ক হয়। কিন্তু যে ভালোবাসার মুখোশ পরে পরামর্শ দেয়, তার কথায় সন্দেহ জন্মায় না। নাজমা যখন বলত—“তুমি তোমার সুখের জন্য লড়ো”, তখন রিয়ার মনে হতো, এ তো তার পক্ষেই কথা বলছে।
আজ সে বুঝতে পারে—সুখের সংজ্ঞা না বুঝে সুখের পেছনে দৌড়ানোই ছিল তার ভুল।
আজ রিয়া একা।
এই একাকীত্ব কোনো সাময়িক অভিমান নয়; এটা পূর্ণ, ভারী, শ্বাসরুদ্ধকর।
পরিবার নেই—নিজের রাগে নিজেই দূরে সরে গেছে।
সংসার নেই—দু’দুবার নিজের হাতে ভেঙেছে।
শরীর অসুস্থ—অপর্যাপ্ত খাবার, অতিরিক্ত পরিশ্রম, আর গর্ভের চাপ মিলিয়ে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মনে অনুশোচনার পাহাড়—যেন বুকের ওপর চেপে বসে আছে।
গার্মেন্টস থেকে ফিরতে ফিরতে কখনো হাঁপিয়ে ওঠে। সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। তবু দরজা খুলে ঘরে ঢুকলে তাকে স্বাগত জানায় নিঃশব্দ দেয়াল। কেউ পানি এগিয়ে দেয় না, কেউ জিজ্ঞেস করে না—“আজ কেমন গেলে?”
এই প্রশ্নের অভাবই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
রিয়া এখন প্রায়ই ভাবে—
সমস্যা ছিল,
কিন্তু সমাধানটা ভুল ছিল।
কুদ্দুছের সঙ্গে তার দূরত্ব ছিল, কথা কম ছিল, অভিমান ছিল। কিন্তু সে কি কখনও বসে পুরোটা খুলে বলেছিল? নাকি সে ভেবেছিল—যে বুঝবে, সে না বললেও বুঝবে?
আর যখন বোঝাপড়া হয়নি, তখন সে পালানোর পথ বেছে নিয়েছে।
অভিমান ছিল,
কিন্তু সিদ্ধান্তটা ছিল তাড়াহুড়ো।
প্রথম বিচ্ছেদের দিনটা এখনো মনে আছে তার। কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তবু সে নিজেকে শক্ত রেখেছিল। ভেবেছিল—এই শূন্যতা সাময়িক, সামনে আলো আছে।
আজ বুঝতে পারে—অন্ধকারের দিকে দৌড়ালে আলো পেছনে পড়ে যায়।
একাকীত্বের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত কখনো কখনো পুরো জীবন বদলে দেয়।
সেই একাকীত্বই তাকে ঠেলে দিয়েছিল নতুন সম্পর্কে। মনে হয়েছিল—কেউ যদি তাকে গুরুত্ব দেয়, শুনে, পাশে থাকে, তাহলে জীবন বদলে যাবে।
জীবন বদলেছে—কিন্তু যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে নয়।
এক সন্ধ্যায় গার্মেন্টস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে রাস্তার পাশে বসে পড়ল রিয়া। একজন বয়স্ক মহিলা এগিয়ে এসে পানি দিলেন। বললেন, “মা, শরীর খারাপ? এভাবে চলবে না।”
‘মা’ শব্দটা শুনে তার চোখ ভিজে উঠল। সে তো সত্যিই মা হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই মা হওয়ার আনন্দ তার জীবনে কেন এত ভারী হয়ে এলো?
ঘরে ফিরে আয়নায় তাকিয়ে সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল—“তুমি কি শুধু ভুলের সমষ্টি?”
না, সে ভুল করেছে, কিন্তু সে শুধুই ভুল নয়।
এই উপলব্ধিটা তাকে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
তার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা। সে চায় না, এই শিশুটি বড় হয়ে মায়ের গল্প শুনে লজ্জা পাক। সে চায় না, তার অস্থিরতা আর তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্তের বোঝা সন্তানের কাঁধে পড়ুক।
রাতের নীরবতায় সে মাঝে মাঝে প্রথম সন্তানের কথা ভাবে। এখন সে কেমন আছে? স্কুলে যায়? মাকে কি মনে পড়ে? হয়তো কুদ্দুছ তাকে আগলে রেখেছে।
এই ভাবনাটা তাকে একই সঙ্গে শান্ত আর ব্যথিত করে। শান্ত—কারণ সন্তান নিরাপদ। ব্যথিত—কারণ সেই নিরাপত্তা সে নিজেই ছেড়ে এসেছে।
কখনো ফোন হাতে নেয়। কুদ্দুছের নম্বর এখনো মুখস্থ। ডায়াল করতে গিয়ে আঙুল থেমে যায়। কী বলবে? “আমি ভুল করেছি?”
এই স্বীকারোক্তির সাহস কি তার হয়েছে?
তবু সে অনুভব করছে—নিজের ভুল স্বীকার না করলে মুক্তি নেই।
ভুলকে দোষারোপ করে, অন্যকে দায়ী করে সে অনেকদিন কাটিয়েছে। আজ সে প্রথমবার নিজের দিকে আঙুল তুলছে।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে শব্দ পড়ছে। সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টির ফোঁটা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
তার মনে হয়—জীবনও কি এমনই? একেকটা সিদ্ধান্ত একেকটা ফোঁটা, মাটিতে পড়ে আর আলাদা করে চেনা যায় না। কিন্তু জমে গেলে বন্যা হয়ে যায়।
তার ভুলগুলোও জমে গেছে।
প্রথমে অভিমান, তারপর বিশ্বাস, তারপর তাড়াহুড়ো, তারপর জেদ।
এই সব মিলিয়েই আজকের এই একাকী জীবন।
তবু আশ্চর্যভাবে তার ভেতরে একটুকরো শক্তি জন্ম নিচ্ছে। হয়তো মাতৃত্বের শক্তি।
সে এখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভবিষ্যতের হিসাব কষে। কীভাবে একটু সঞ্চয় করবে, কীভাবে ভালো চিকিৎসা নেবে, কীভাবে সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করবে।
আজ তার কাছে কেউ নেই—
শুধু আছে তার ভুলগুলো,
তার অনুশোচনা,
আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু এই ‘কেউ নেই’ কথাটা পুরোপুরি সত্যি কি?
তার ভেতরে তো একটি প্রাণ আছে।
যে এখনো কোনো বিচার করেনি, কোনো অভিযোগ করেনি।
যে নিঃশর্তভাবে তার ওপর নির্ভর করছে।
এই নির্ভরতাই তাকে আবার দাঁড়াতে শেখাচ্ছে।
রিয়া আজ বুঝতে শিখেছে—সমস্যা এলে পালানো সমাধান নয়। কথা বলা, ধৈর্য ধরা, সময় দেওয়া—এসবই ছিল আসল পথ। সে ভুল পথে হেঁটেছে, কিন্তু পথ এখানেই শেষ নয়।
অচেনা ঠিকানায় দাঁড়িয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের নতুন পরিচয় গড়ছে। আর সেই পরিচয় আর কারও কথায় নির্ভর করবে না।
রাত গভীর হয়।
সে পেটের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে—
“আমি তোমার জন্য লড়ব। আমার ভুলের জন্য তুমি শাস্তি পাবে না।”
তার চোখে জল আসে, কিন্তু সেই জলে শুধু অনুশোচনা নেই—আছে প্রতিজ্ঞাও।
অচেনা ঠিকানার পথ দীর্ঘ, কষ্টে ভরা।
তবু এবার সে বুঝেছে—সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হৃদয় আর বিবেক—দুটোর কথাই শুনতে হয়।
হয়তো দেরিতে শেখা এই শিক্ষাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
চলবে...............