ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:১৮:৪২ AM

উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

মান্নান মারুফ, বিশেষ প্রতিনিধি
26-02-2026 12:57:33 PM
উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

পর্ব–৭

তারপর গোপনে বিয়ে করল রিয়া।
সেই মানুষটাকে, যার সঙ্গে তার প্রেম ঘনিষ্ঠ রূপ ধারণ করেছিল।
যাকে সে “ভালোবাসা” ভেবেছিল।

বিয়েটা হয়েছিল খুব নিঃশব্দে। না ছিল আত্মীয়স্বজনের ভিড়, না ছিল আশীর্বাদের শব্দ। ছোট্ট একটা কাবিননামা, দু’জন সাক্ষী, আর একরাশ তাড়াহুড়ো করা স্বপ্ন। রিয়ার মনে হয়েছিল—এইবার বুঝি সে সত্যিকারের সুখের দরজা খুলে ফেলেছে। এতদিনের অস্থিরতা, লুকোনো সম্পর্ক, সমাজের চোখ এড়িয়ে চলা—সবকিছুর অবসান ঘটবে।

সে ভেবেছিল, এবার তার জীবনে শান্তি আসবে।

প্রথম কয়েক সপ্তাহ সত্যিই যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল। নতুন বাসা, নতুন বিছানা, নতুন পরিচয়—“স্ত্রী” শব্দটা আবারও তার জীবনে ফিরে এলো, তবে ভিন্ন একজনের পাশে। মানুষটি তাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “এখন তুমি শুধু আমার।” এই “আমার” শব্দের ভেতর রিয়া একধরনের নিরাপত্তা খুঁজে পেত।

কিন্তু ভালোবাসার মুখোশ খুলে যেতে সময় লাগল মাত্র চার মাস।

খুব ছোট একটি বিষয় নিয়ে প্রথম ঝগড়াটা হয়েছিল। রিয়া একদিন তার পুরোনো সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে যেতে চেয়েছিল। সে কথাটা শুনেই নতুন স্বামীর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। ঠাণ্ডা গলায় বলল, “তোমার অতীতকে নিয়ে এত টানাটানি কেন? এখন তুমি আমার সংসারের মানুষ।”

রিয়া থমকে গিয়েছিল। সে তো শুধু মা হিসেবে একটু সময় চেয়েছিল।

সেই রাতেই প্রথম চড়টা পড়ে তার গালে।

মুহূর্তটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে রিয়া বুঝে উঠতে পারেনি। কানে যেন বজ্রপাতের শব্দ হলো, চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেল সবকিছু। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। মানুষটি, যাকে সে ভালোবেসে সব ছেড়েছে, সেই মানুষই তাকে আঘাত করল!

কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলেছিল, “তুমি আমাকে মারলে?”

উত্তরে এসেছিল আরও কঠিন স্বর—“শিখে যাও, আমার কথা অমান্য করলে এটা হবেই।”

সেদিন রাতে রিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া গাল ছুঁয়ে দেখেছিল। চোখে পানি জমছিল, কিন্তু তার চেয়ে বড় ছিল বিস্ময়। এই কি সেই ভালোবাসা, যার জন্য সে এক নিঃশব্দ, ভরসার মানুষকে ছেড়ে এসেছে?

ধীরে ধীরে মারধর, অপমান, ভয় দেখানো—সবকিছু নিয়মিত হয়ে উঠল। কখনো দেরিতে খাবার দেওয়ার জন্য, কখনো কারও ফোন ধরার জন্য, কখনো শুধু সন্দেহের বশে। তার নতুন স্বামী ক্রমেই নিয়ন্ত্রণকারী, রূঢ় আর হিংস্র হয়ে উঠছিল।

রিয়ার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরত—
“তার আগের স্বামী কখনো গায়ে হাত তোলেনি…”

কুদ্দুছের সঙ্গে তার দূরত্ব ছিল, অভিমান ছিল, কিন্তু অপমান ছিল না। কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেনি, কখনো সন্দেহ করেনি। ব্যস্ত ছিল—হ্যাঁ, খুব ব্যস্ত ছিল। কিন্তু সে নিরাপদ ছিল।

এখন? এখন সে প্রতিদিন ভয়ে কাঁপে।

একদিন গভীর রাতে ঝগড়ার পর তাকে ঘরের বাইরে তালাবদ্ধ করে রাখা হলো। বারান্দার মেঝেতে বসে রিয়া কাঁদছিল। আকাশে মেঘ ছিল, হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর কাঁপছিল, কিন্তু তার ভেতরের কাঁপুনি ছিল আরও গভীর। সে মনে মনে বলছিল—“আমি কী করেছি? কেন করেছি?”

ভোরের দিকে দরজা খুলে গেল। যেন কিছুই হয়নি, এমন স্বাভাবিক আচরণ। এই অদ্ভুত দ্বৈত চরিত্র তাকে আরও বিভ্রান্ত করত। কখনো ভালোবাসার অভিনয়, কখনো হিংস্র রূপ—কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা?

এর মধ্যেই একদিন হঠাৎ মাথা ঘোরা, বমি ভাব শুরু হলো। প্রথমে সে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু কয়েকদিন পর সন্দেহ জাগল। টেস্ট করার পর সে জানতে পারল—রিয়া এক মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

খবরটা হাতে নিয়ে তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

এই সন্তান? এই ভয়ের সংসারে? যে মানুষটি তাকে প্রতিদিন অপমান করে, তার সন্তানের মা হতে যাচ্ছে সে?

তার চোখে ভেসে উঠল আগের সন্তানের মুখ। কত আদরে, কত স্বপ্নে তাকে বড় করতে চেয়েছিল! আর আজ… আজ সে নিজেই নিরাপত্তাহীন।

নতুন স্বামীকে খবরটা জানাতেই সে প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর অদ্ভুতভাবে হেসে বলল, “দেখছো? এখন তুমি কোথাও যেতে পারবে না। আমার সন্তান তোমার ভেতরে।”

কথাগুলো ছুরি হয়ে বিঁধল রিয়ার হৃদয়ে। সে বুঝল, এই সন্তান তার জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং শিকল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ভয়, অনুশোচনা, একাকীত্ব—সব মিলিয়ে রিয়া ভেঙে পড়ছিল।

রাতে সে বিছানায় শুয়ে পেটের ওপর হাত রাখত। ভেতরে এক অদৃশ্য প্রাণের স্পন্দন, আর বাইরে নির্মম বাস্তবতা। সে ফিসফিস করে বলত, “আমি কি তোমাকে এই পৃথিবীতে আনতে পারব? এই অন্ধকারে?”

তার পরিবার থেকে সে অনেক দূরে। যোগাযোগ বন্ধ করে রেখেছে নিজের জেদে। এখন ফোন করতে চাইলেও সাহস পায় না। কী বলবে? “আমি ভুল করেছি?” সেই স্বীকারোক্তির ভার তার অহংকার নিতে চায় না, কিন্তু তার ভেঙে পড়া মন চায় আশ্রয়।

একদিন প্রচণ্ড মারধরের পর সে মেঝেতে পড়ে ছিল। মাথা ঘুরছিল, চোখ ঝাপসা। হঠাৎ তার মনে হলো—তার ভেতরে তো আরেকটা প্রাণ আছে! সে আতঙ্কে উঠে বসে পেট চেপে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ল। নিজের জন্য নয়, অনাগত সন্তানের জন্য।

সেই মুহূর্তে প্রথমবার তার মনে স্পষ্ট হলো—এই জীবন থেকে তাকে বেরোতে হবে। যেভাবেই হোক।

কিন্তু কোথায় যাবে? কে তাকে গ্রহণ করবে? সমাজ কি আবার আঙুল তুলবে না? আগের স্বামীর কাছে কি মুখ দেখাতে পারবে? সন্তানের কাছে?

তার মাথায় শুধু একটাই উপলব্ধি ধাক্কা মারছিল—সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু তার ফল বহন করা ভয়ংকর কঠিন।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল রিয়া। রাত গভীর, শহর নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক। তার মনে হলো, সে যেন এক অচেনা ঠিকানায় আটকে গেছে—যেখানে পথ আছে, কিন্তু দিশা নেই।

চোখ বন্ধ করতেই কুদ্দুছের শান্ত মুখটা ভেসে উঠল। সেই নিরীহ প্রশ্ন—“এটাই কি তোমার শেষ সিদ্ধান্ত?”
রিয়ার বুকের ভেতর হাহাকার উঠল।

আজ যদি সময়টা ফিরিয়ে আনা যেত!

কিন্তু সময় কারও জন্য থামে না।

পেটের ভেতরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব তাকে একই সঙ্গে শক্ত আর দুর্বল করে তুলছিল। সে জানে, এই সন্তানের জন্য তাকে বাঁচতে হবে, লড়তে হবে। কিন্তু ভয়ের ছায়া তাকে প্রতিদিন গ্রাস করছে।

অচেনা ঠিকানার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রিয়া বুঝতে পারছে—ভালোবাসা নামের যে আলোকে সে অনুসরণ করেছিল, তা ছিল মরীচিকা। আর এখন সে মরুভূমির মাঝখানে একা, তৃষ্ণার্ত, দিশেহারা।

তার চোখ বেয়ে নেমে আসে নীরব অশ্রু।
এই অশ্রুতে আছে ভুলের শাস্তি, আছে অনাগত সন্তানের জন্য আতঙ্ক, আর আছে হারিয়ে ফেলা এক নিরাপদ জীবনের জন্য গভীর অনুশোচনা।

অচেনা ঠিকানার পথ আরও অন্ধকার হয়ে উঠছে…

চলবে......................