ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:২১:৫২ AM

উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

মান্নান মারুফ, বিশেষ প্রতিনিধি
26-02-2026 12:28:47 PM
উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

পর্ব–৫

বাইরে থেকে মনে হতো রিয়া খুব ভালো আছে। মুখে হালকা হাসি, সাজানো সংসার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো ছবির ফ্রেম—সব মিলিয়ে যেন এক নিখুঁত জীবনের গল্প। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খেত। রাতের গভীরে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চোখের ভেতর যে অচেনা নারীটাকে সে দেখত, তাকে সে নিজেই চিনতে পারত না।

তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল—হ্যাঁ, ছিল অভিমান, ছিল অবহেলা, ছিল না-বলা কথার স্তূপ। তবুও কুদ্দুছ কখনও তাকে ঠকায়নি। সংসারের দায়, সন্তানের স্বপ্ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা—সব কিছুর ভার সে নীরবে কাঁধে তুলে নিয়েছিল। হয়তো ভালোবাসা প্রকাশ করতে জানত না, হয়তো কথায় কোমলতা ছিল না, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার কালিমা তার হাতে লাগেনি।

আর রিয়া… রিয়া নিজের ভেতরেই নিজেকে ছোট মনে করতে লাগলো।

একটা সময় পর্যন্ত সে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। বারবার নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে—এটা ভুল, এটা পাপ, এটা বিশ্বাসভঙ্গ। কিন্তু মানুষ যখন ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যায়, তখন যুক্তি বড় সহজে হৃদয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় না। একাকীত্ব এক অদৃশ্য ফাঁদ; সেখানে আটকে গেলে মুক্তির পথও কাঁটার মতো বিঁধে।

রিয়া তার সব কথা এক বান্ধবীর সঙ্গে শেয়ার করত—নাজমা। কলেজজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নাজমা আধুনিক, খোলামেলা চিন্তার। তার যুক্তি স্পষ্ট, তার ভাষা নির্দ্বিধা। সে বলত—
“এই যুগে এগুলো নরমাল।”
“হাজবেন্ড ঠিক না থাকলে অন্য সম্পর্কে যাওয়া দোষ না।”
“ডিভোর্স দিয়ে যাকে ভালোবাসো তাকে বিয়ে করো।”

প্রথম প্রথম এই কথাগুলো শুনে রিয়ার বুক কেঁপে উঠত। তার ভেতরের বিবেক যেন প্রতিবাদ করত—‘না, এটা ঠিক নয়।’ কিন্তু প্রতিবার নাজমার যুক্তির দেয়ালে সেই প্রতিবাদ ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসত। নাজমা বলত, “তুমি তো মানুষ, পাথর না। তোমারও তো ভালোবাসা চাই, সম্মান চাই। শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের জীবন পুড়িয়ে ফেলবে?”

ধীরে ধীরে সেই কথাগুলো তার অপরাধবোধকে যুক্তিতে ঢেকে দিল। মনে হতে লাগল, সে তো সুখের অধিকারী। তার স্বামী যদি তাকে মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দেয়, তবে সে কেন শূন্যতায় ডুবে থাকবে?

কিন্তু সত্যি কি এত সহজ?

রাত গভীর হলে, যখন ঘরের সব আলো নিভে যায়, কুদ্দুছ পাশ ফিরে ঘুমিয়ে থাকে—তখন রিয়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপা কান্না জমে ওঠে। সে তাকিয়ে থাকে ছাদের দিকে। মনে পড়ে যায় বিয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা। কত স্বপ্ন, কত হাসি! কুদ্দুছের হাত ধরেই তো সে এই শহরে এসেছিল। নতুন সংসার, নতুন জীবন—সবকিছুতেই একসাথে পথ চলার অঙ্গীকার ছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অঙ্গীকারে ধুলো জমেছে, কিন্তু তা কি ভেঙে গেছে?

রিয়া জানে, তার জীবনে যে নতুন মানুষটির আগমন ঘটেছে—তার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। সে মন দিয়ে শোনে, প্রশংসা করে, অনুভূতির দাম দেয়। রিয়ার মনে হয়, বহুদিন পর কেউ তাকে “দেখছে”—শুধু স্ত্রী বা সন্তানের মা হিসেবে নয়, একজন নারী হিসেবে।

এই অনুভূতিই তাকে দুর্বল করে দেয়।

একদিন বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল রিয়া। মেঘে ঢাকা সূর্য, হালকা বাতাস। হঠাৎ কুদ্দুছ পেছন থেকে এসে বলল, “চা খাবে?” কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, তবু আন্তরিকতা ছিল। রিয়া চমকে উঠল। এই মানুষটাকেই তো সে একসময় ভালোবেসেছিল! আজ কেন তার উপস্থিতি তাকে অপরাধীর মতো অস্থির করে তোলে?

সে বুঝতে পারে, সমস্যা শুধু কুদ্দুছ নয়। সমস্যা তাদের মাঝখানের নীরবতা। অগণিত না-বলা কথা জমে আছে দেয়ালের মতো। কেউ ভাঙতে চায়নি, কেউ ভাঙার সাহসও পায়নি।

নাজমা একদিন সরাসরি বলেছিল, “তুমি কি কুদ্দুছকে ভালোবাসো?”

রিয়া উত্তর দিতে পারেনি। ভালোবাসা কি শুধুই উত্তেজনা? না কি দীর্ঘদিনের সহমর্মিতা? যদি ভালোবাসা শেষই হয়ে যায়, তবে কেন তার বুকের ভেতর এখনও কষ্ট হয়? কেন কুদ্দুছ অসুস্থ হলে তার মন ছটফট করে?

নিজের কাছে প্রশ্ন করতে করতে সে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

সমাজের চোখে সে এখনও আদর্শ স্ত্রী। আত্মীয়স্বজনের সামনে হাসিমুখে কথা বলে, দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু নিজের ভেতরে সে জানে—সে এক অদৃশ্য সীমা অতিক্রম করেছে। যদিও সে শারীরিকভাবে কোনো ভুল করেনি, তবুও মানসিক টানাপোড়েন তাকে প্রতিদিন অপরাধী বানিয়ে দেয়।

এক রাতে মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটি মেসেজ তার বুক কাঁপিয়ে দিল। নতুন মানুষটি লিখেছে—“তুমি চাইলে আমরা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারি।”

এই একটি বাক্য যেন তার সামনে দুইটা রাস্তা খুলে দিল। একদিকে দীর্ঘদিনের সংসার, দায়িত্ব, বিশ্বাস। অন্যদিকে অজানা এক সুখের প্রতিশ্রুতি।

সে অনেকক্ষণ ধরে মেসেজটির দিকে তাকিয়ে রইল। উত্তর লিখতে গিয়ে আঙুল থেমে গেল। মনে হলো, এই উত্তর শুধু একটি সম্পর্কের নয়—তার সমগ্র অস্তিত্বের।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে সন্তানের ঘুমের মধ্যে ডাকা—“মা…”
রিয়ার বুক কেঁপে উঠল। সে ছুটে গিয়ে সন্তানের কপালে হাত রাখল। ছোট্ট মুখ, নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস। এই শিশুটির পৃথিবী তো তার উপরেই দাঁড়িয়ে।

সে বুঝল, জীবনের সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সেখানে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক প্রাণ, অনেক স্বপ্ন।

পরদিন সকালে কুদ্দুছ নীরবে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।”

কুদ্দুছ অবাক হলো। “কী কথা?”

রিয়া দীর্ঘদিনের জমে থাকা সাহসটুকু একত্র করল। “আমরা কি একবার বসে কথা বলতে পারি? আমাদের নিয়ে… আমাদের দূরত্ব নিয়ে?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “আমিও তো অনেকদিন বলতে চেয়েছি।”

এই প্রথম তাদের চোখে চোখ পড়ল—অভিমান নয়, অভিযোগ নয়—একটা ক্লান্ত স্বীকারোক্তি।

সেদিন তারা অনেক কথা বলল। না-বলা কষ্ট, ভুল বোঝাবুঝি, অবহেলার কারণ—সব খুলে বলল। কুদ্দুছ স্বীকার করল, সে কাজের চাপে রিয়াকে সময় দিতে পারেনি। রিয়া স্বীকার করল, সে নিজেকে একা অনুভব করেছে।

কোনো অলৌকিক সমাধান সেদিন হয়নি। কিন্তু তারা বুঝল—ভাঙনের আগে চেষ্টা করা উচিত ছিল।

রিয়া সেই রাতে মোবাইলের মেসেজটির উত্তর দিল—“আমি আমার সংসার বাঁচানোর চেষ্টা করতে চাই।”

উত্তর পাঠিয়ে তার বুক হালকা হলো, আবার ভারীও হলো। কারণ সে জানে, এই পথ সহজ নয়। বিশ্বাস একবার দুলে উঠলে তাকে স্থির করতে সময় লাগে।

তবুও সে সিদ্ধান্ত নিল—পালিয়ে নয়, মুখোমুখি হয়েই সে নিজের ঠিকানা খুঁজবে।

অচেনা ঠিকানার পথে হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে শিখছে—সুখ কখনও শুধু নতুন কারও হাতে নয়; কখনও তা পুরোনো সম্পর্কের ধুলো ঝেড়ে আবার খুঁজে নিতে হয়।

রিয়ার চোখে জল এল। কিন্তু সেই জলে শুধু অপরাধবোধ নয়, ছিল একটুখানি আশার আলোও।

হয়তো এই আলোই তাকে তার হারিয়ে যাওয়া নিজেকে আবার চিনতে শেখাবে।

 
চলবে.................