ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩১:২৫ AM

প্রথম পরিচয়-৫

মান্নান মারুফ
16-01-2026 12:39:46 PM
প্রথম পরিচয়-৫

পর্ব ৫: প্রথম বন্ধন

সিডনির বিকেল ধীরে ধীরে গোধূলিতে মিলিয়ে গেছে। কফির গরম বাষ্প বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে, রাস্তায় মানুষের হালকা পদচারণা। ছোট একটি টেবিলে পাশাপাশি বসে আছে কুদ্দুছ ও অ্যামেলিয়া। সন্ধ্যার আলো তাদের চোখে এনে দিয়েছে নতুন এক ঝলক—আশার আলো।

হেসে অ্যামেলিয়া বলল,
“তুমি জানো, তোমার গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হয়েছে—আমার জীবন যেন খুব ছোট আর সাজানো। তুমি দেখালে, জীবন কত সহজ আর সুন্দর হতে পারে।”

কুদ্দুছ তাকিয়ে রইল।
“ছোট ছোট জিনিসেই তো আসল সুখ,” সে বলল। “কখনো ভেবেছ, বর্ষার বৃষ্টিতে কাদায় ভিজে, গ্রামের মাটির গন্ধে কী গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে?”

অ্যামেলিয়ার চোখে বিস্ময়।
“আমি কখনো এমনটা অনুভব করিনি। তোমার চোখে সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।”

কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলল,
“হয়তো কারণ আমি সত্যিই অনুভব করি। আর যে অনুভব করতে পারে, সে বুঝতে পারে—আনন্দ কোথায়।”

তাদের চোখে তৈরি হলো এক নীরব বন্ধন। কোনো শব্দ নেই—শুধু অনুভূতি। কফির উষ্ণতা, বাতাসের হালকা ছোঁয়া আর দূরের মানুষের চলাচল—সব মিলেমিশে জন্ম দিল এক শান্ত মুহূর্তের।

“তুমি কি কখনো ভেবেছ,” অ্যামেলিয়া বলল, “শুধু গল্প শুনেই একজন মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“হয়তো পারে—যদি কেউ মন দিয়ে শোনে। তোমার চোখে আমি সেই মনোযোগটাই দেখি।”

অ্যামেলিয়ার ঠোঁটে মৃদু হাসি।
“আমি শুনতে চাই। আমি তোমার পৃথিবীতে ঢুকতে চাই।”

ক্যাফের বাইরে হালকা বাতাস বইছে। পেছন দিক থেকে হঠাৎ একটি গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। তারা একে অপরের দিকে তাকাল—কোনো কথার প্রয়োজন রইল না।

কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল,
“আমি জানি, এই সম্পর্ক সহজ নয়। তোমার পরিবার, আমার ভিসা—সবই আমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।”

অ্যামেলিয়া তার হাত চেপে ধরল।
“যদি সত্যি ভালোবাসা থাকে, আমরা পেরিয়ে যাব। চোখে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়।”

মুহূর্তটি দীর্ঘ হয়ে উঠল। কফির বাষ্প, বাতাসের নড়াচড়া আর হৃদয়ের স্পন্দন—সব মিলেমিশে তৈরি করল এক নতুন বাস্তবতা।

“আমি ভয় পাচ্ছি,” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু ভয় পেলেও আমরা একে অপরকে ধরে রাখব।”

কুদ্দুছ হেসে বলল,
“হ্যাঁ। সেই ভরসাতেই আমরা আমাদের পৃথিবী গড়ে তুলব।”

কফির শেষ চুমুকে তারা ছোট ছোট গল্পে মেতে উঠল—বর্ষার দিনে মাটির গন্ধ, গ্রামের মেঠোপথে ছুটে চলা। কুদ্দুছ বলল,
“একদিন তুমি আমার গ্রামের রাস্তা দেখবে—যেখানে মাটির গন্ধ আর ছোট সুখ একসাথে মিশে আছে।”

অ্যামেলিয়ার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
“আমি চাই। আমি আসব।”

তাদের কথোপকথন ছিল ছোট, সরল—তবু গভীরভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কফির উষ্ণতা আর বাতাসের কোমলতা মিলিয়ে গড়ে উঠল তাদের নিজস্ব এক পৃথিবী।

“এই মুহূর্তে,” কুদ্দুছ ধীরে বলল, “আমার মনে হয়, পৃথিবী আমাদের জন্য একটু জায়গা করে দিয়েছে। এই ছোট টেবিল, এই আলো, আমাদের চোখে চোখ—সবই যেন নতুন শুরু।”

অ্যামেলিয়ার হাত কুদ্দুছের হাতে।
“হ্যাঁ। আমরা একে অপরকে হারাব না। আমাদের সম্পর্ক শুধু আজকের নয়—আগামীদিনেরও।”

একটি ছোট হাসি, একটি নীরব স্পর্শ। তাদের মধ্যকার প্রথম বন্ধন দৃঢ় হয়ে উঠল।

কফির কাপ খালি হয়ে এলে তারা চোখে চোখ রেখে একসাথে বলল,
“এটাই আমাদের নতুন শুরু।”

ক্যাফের বাইরে মানুষের চলাচল, হালকা বাতাস—সব মিলেমিশে মনে হলো, শহরটি যেন এখন তাদেরই। এক নতুন পৃথিবী, যেখানে প্রেমই সবচেয়ে বড় সত্য।

চলবে…