ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩১:০৫ AM

প্রথম পরিচয়-৬

মান্নান মারুফ
16-01-2026 12:41:13 PM
প্রথম পরিচয়-৬

পর্ব ৬: শ্রেণীর দেয়াল

ঢাকার রাস্তায় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কুদ্দুছ জানে—আজকের দিনটি তার জীবনে আলাদা গুরুত্ব নিয়ে এসেছে। সিডনির স্বপ্নময় শহর পেছনে ফেলে এখানে ফিরে এসে সে উপলব্ধি করছে, ভালোবাসা শুধু দু’জন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের অদৃশ্য দেয়াল, শ্রেণীর বিভাজন আর পারিবারিক প্রভাব—সব মিলেই এখন তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাফেতে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে কুদ্দুছ অ্যামেলিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে জমে আছে এক দমবন্ধ করা আবেগ।

“তুমি কি জানো,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল, “আজ তোমার সঙ্গে দেখা করাটাই আমার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?”

অ্যামেলিয়া ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি জানি। তবু আমি তোমার পাশে থাকতে চাই—যত ঝুঁকিই আসুক।”

কুদ্দুছ গভীর নিঃশ্বাস নিল।
“আমার ভিসা, পড়াশোনা—সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে। কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবী আমাদের জন্য কোনো জায়গাই রাখেনি।”

“পৃথিবী যদি জায়গা না দেয়,” অ্যামেলিয়া শান্ত স্বরে বলল,
“আমরা নিজেরাই আমাদের জায়গা তৈরি করব। একে অপরের জন্য—আমাদের ছোট পৃথিবী।”

তাদের কথায় ছিল অদ্ভুত এক সাহস, অদম্য দৃঢ়তা। কফির উষ্ণতা আর বাতাসের হালকা স্পর্শ মিলিয়ে তাদের চারপাশে গড়ে উঠল এক নতুন বাস্তবতা।

কিন্তু বাস্তবতা কখনোই এত সহজ নয়।

কয়েকদিন পর অ্যামেলিয়ার বাবা জানতে পারলেন—তার মেয়ের সম্পর্ক এক বাংলাদেশি ছাত্রের সঙ্গে। ঘরে ঢুকেই তিনি কঠোর কণ্ঠে বললেন,
“অ্যামেলিয়া! তুমি কী ভেবে এসব করছ? আমাদের নাম, পরিচয়, পরিবারের সম্মান—সবকিছু কি ভুলে গেছ?”

অ্যামেলিয়া অদ্ভুত দৃঢ়তায় উত্তর দিল,
“বাবা, আমি চাই আপনি আমার হৃদয়ের কথা শুনুন। আমি সত্যিকারের অনুভূতি চাই। কুদ্দুছের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সত্য।”

বাবা রাগ সামলাতে না পেরে বললেন,
“তুমি বুঝতে পারছ না, তুমি নিজেকে কত বড় বিপদের মধ্যে ফেলছ। আমি চাইলে তোমার ভিসা বাতিল করাতে পারি, তোমার ভবিষ্যৎ শেষ করে দিতে পারি। এই ভালোবাসা—এটা শুধু ভুল।”

অ্যামেলিয়ার চোখে তখন এক শান্ত দৃঢ়তা, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
“আমি জানি। কিন্তু হৃদয় কখনো ভুল পথ দেখায় না। আর কুদ্দুছ—সে আমার হৃদয়কে বোঝে।”

সেই রাতে কুদ্দুছ একা বসে ভাবতে লাগল—
“কাল সকালে হয়তো ইমিগ্রেশন পুলিশ আসবে, স্কলারশিপ বাতিল হবে। আমার জীবন যেন অস্থির এক সমুদ্র। তবু অ্যামেলিয়ার সঙ্গে এই মুহূর্তের জন্য সব ঝুঁকি মূল্যবান।”

ফোনে ফিসফিস করে সে বলল,
“অ্যামেলিয়া, তুমি ভুল করছ। তোমার নিরাপদ রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আমার অস্থির জীবনে আসা ঠিক নয়। আমি হয়তো কালই সব হারাব।”

ফোনের ওপাশ থেকে এল শান্ত, অবিচল কণ্ঠ—
“পৃথিবী যদি আমাদের জন্য জায়গা না রাখে, আমরা নিজেরাই পৃথিবী বানাব। তুমি চিন্তা করো না—আমি আছি।”

কুদ্দুছের চোখে জমে উঠল এক দমবন্ধ করা অনুভূতি। এই দৃঢ়তা, এই সাহস—কোনো বইয়ের শিক্ষা নয়, কোনো উপদেশের ফল নয়। এটি শুধু সত্যিকারের ভালোবাসার শক্তি।

কয়েকদিন পর তারা আবার ক্যাফেতে বসে গল্প করছিল। অ্যামেলিয়া বলল,
“আমি জানি, আমরা বড় ঝুঁকির মধ্যে আছি। তবু আমি চাই—আমি তোমার পাশেই থাকব।”

কুদ্দুছের চোখে নেমে এলো এক গভীর শান্তি।
“আমার ভিসা, পড়াশোনা—সবই হুমকির মুখে। কিন্তু তোমার হাত যদি আমার হাতে থাকে, সব ঝুঁকি সহনীয় হয়ে যায়।”

তাদের কথাগুলো ছিল ছোট, সরল—তবু গভীরভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কফির উষ্ণতা আর বাতাসের কোমলতা মিলিয়ে আবার তৈরি হলো তাদের নিজস্ব পৃথিবী।

“তুমি জানো,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল,
“আমি কখনো ভাবিনি কারো চোখে এত দৃঢ়তা থাকতে পারে। তুমি শুধু ভালোবাসো না—তুমি দেখাও, ভালোবাসা কীভাবে সম্ভব।”

অ্যামেলিয়ার চোখ জ্বলে উঠল।
“আমি এখানেই আছি। আর থাকব।”

হঠাৎ বাইরে বাতাসের শব্দ শোনা গেল। কফির কাপের উষ্ণতায় তাদের হাত দু’টি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেল।

“এটাই আমাদের পৃথিবী,” কুদ্দুছ বলল।

“হ্যাঁ,” অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“আমাদের নিজের ছোট পৃথিবী—পৃথিবী যত বাধাই দিক না কেন।”

সেই রাতে তারা নীরবে চোখে চোখ রেখে বসে ছিল। কোনো শব্দ নয়—শুধু অনুভূতি। ক্যাফের নরম আলো আর কফির উষ্ণতা মিলিয়ে তৈরি করল এক নতুন বাস্তবতা।

“শোনো,” কুদ্দুছ ধীরে বলল,
“পৃথিবী যদি আমাদের জন্য সব দরজা বন্ধ করে দেয়, আমরা নিজেরাই জানালা খুলব।”

অ্যামেলিয়ার চোখে রোমাঞ্চের দীপ্তি।
“আমি জানি। আমরা একে অপরকে হারাব না।”

শ্রেণীর দেয়াল যত উঁচুই হোক, চোখে চোখের এই পৃথিবী সব বাধা পেরিয়ে যাবে—যেখানে ভালোবাসাই সবচেয়ে শক্তিশালী সত্য।

চলবে…