পর্ব ৮: এক রাতের সিদ্ধান্ত
সিডনির গভীর রাত ঢাকার আলোয় এসে মিশে গেছে। কুদ্দুছ জানে—ভিসার ঝুঁকি, পড়াশোনার চাপ আর অ্যামেলিয়ার পরিবারের রোষ—সব মিলিয়ে আজ তার জীবনের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। তবে হৃদয়ের ভেতর আরেকটি ভয় আরও স্পষ্ট—অ্যামেলিয়া নিরাপদ থাকবে তো?
ক্যাফের বাইরে তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। বাতাসে হালকা বর্ষার গন্ধ। রাস্তায় মানুষের চলাচল, অথচ তাদের দৃষ্টিতে শুধুই একে অপরের পৃথিবী।
“কুদ্দুছ,” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল,
“আমি ভাবছি—আজ আমরা সব ঝুঁকি ভেঙে নতুন করে শুরু করতে পারি।”
কুদ্দুছ ধীরে শ্বাস নিল।
“অ্যামেলিয়া, তুমি কি নিশ্চিত? যদি তোমার পরিবার… যদি আমাদের জীবন—”
অ্যামেলিয়া শান্ত স্বরে বলল,
“আমি জানি ঝুঁকি আছে। কিন্তু যদি আমরা একে অপরকে না হারাই, সবকিছুই সহনীয় হয়ে যায়।”
কুদ্দুছের চোখে দমবন্ধ করা আবেগ।
“আমি তোমাকে নিরাপদ রাখতে চাই। তবু যদি তুমি সত্যিই চাও—আমি তোমার সঙ্গেই আছি।”
রাস্তায় হালকা বৃষ্টি নামল। কফির কাপ থেকে শেষ চুমুক নেওয়া হলো। অ্যামেলিয়ার চোখে ঝিলিক।
“তুমি শুধু গল্প বলো না,” সে বলল, “তুমি দেখাও—ভালোবাসা কীভাবে সত্যি হয়।”
ক্যাফে ছেড়ে তারা হেঁটে ঢুকে পড়ল এক অন্ধকার পার্কে। চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ, বাতাস আর তাদের নিঃশ্বাসের ছন্দ।
“আজ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” অ্যামেলিয়া বলল।
“এই শহর, এই পরিবার—সব পেছনে রেখে আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
কুদ্দুছ মৃদু হাসল।
“আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু তুমি পাশে থাকলে, ঝুঁকিও সহজ মনে হয়।”
এক মুহূর্ত তারা নীরবে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। দূরের আলো, ভেজা রাস্তা—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্তি তৈরি করল।
“শোনো,” কুদ্দুছ নিচু স্বরে বলল,
“আমাদের এই সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক। কিন্তু আজ থেকে আমাদের জীবন একসাথেই শুরু।”
অ্যামেলিয়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
“আমি জানি। আমি এখানেই আছি। আর থাকব।”
সেই রাতেই তারা বুঝে নিল—ভিসা, পড়াশোনা, সামাজিক দেয়াল—সবকিছু এই মুহূর্তে গৌণ। গুরুত্বপূর্ণ শুধু চোখে চোখের বিশ্বাস, হাতের স্পর্শ আর একে অপরের প্রতি নিঃশর্ত আস্থা।
“আমি কখনো ভাবিনি,” কুদ্দুছ বলল,
“আমার জীবনে এমন সাহস আসবে। তুমি শুধু ভালোবাসো না—তুমি দেখাও, ভালোবাসা কতটা শক্তিশালী হতে পারে।”
অ্যামেলিয়া হাসল।
“এটাই আমাদের নতুন শুরু। আমরা একে অপরকে হারাব না।”
রাত আরও গভীর হলো। শহরের আলো নিস্তব্ধ। তারা হাতে হাত ধরে এগিয়ে চলল বিমানবন্দরের দিকে—হৃদয়ে এক অদৃশ্য বন্ধন।
“এই যাত্রা তো কেবল শুরু,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল।
“আমাদের পৃথিবী আমরা নিজেরাই তৈরি করব,” অ্যামেলিয়া বলল।
বোর্ডিং গেটে পৌঁছে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। কুদ্দুছ অনুভব করল—এই রাতের সিদ্ধান্ত মানে এক নতুন জীবন, এক নতুন লড়াই, এক নতুন স্বাধীনতা।
“আজ আমরা শুধু একে অপরের জন্য দাঁড়িয়েছি,” কুদ্দুছ বলল।
“আর থাকব চিরকাল,” অ্যামেলিয়া হেসে উত্তর দিল।
এক রাতের সিদ্ধান্ত, এক হাতে হাত, এক চোখে চোখ—সব মিলেমিশে তৈরি হলো তাদের নতুন পৃথিবী, যেখানে ভালোবাসাই সবচেয়ে শক্তিশালী সত্য।
চলবে…