ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩১:০৫ AM

প্রথম পরিচয়-৯

মান্নান মারুফ
16-01-2026 01:00:54 PM
প্রথম পরিচয়-৯

পর্ব ৯: সিডনি থেকে ঢাকা

ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণ ঢাকার বিমানবন্দরের টার্মিনালে এসে পড়ল। কুদ্দুছের হৃদয় অস্থির—উত্তেজনা আর ভয়ের মিশ্র অনুভূতি। তার হাতে অ্যামেলিয়ার হাত। সে জানে, আজকের দিনটি তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি।

“তুমি জানো, কুদ্দুছ,” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল,
“এই মুহূর্তে বুঝতে পারছি—পৃথিবীর সব আলো, সব আভিজাত্য, সব প্রভাবের কোনো মূল্য নেই আমার কাছে। মূল্যবান শুধু তোমার সঙ্গে থাকা।”

কুদ্দুছের চোখে নেমে এলো এক গভীর শান্তি।
“আমি জানি। আর আমরা একে অপরকে হারাব না। এই শহর, এই নতুন জীবন—সবই সহজ হয়ে যাবে যদি তুমি পাশে থাকো।”

বিমানের দরজা খুলতেই তারা ঢাকার গরম, ভ্যাপসা বাতাসে পা রাখল। অ্যামেলিয়ার চোখে বিস্ময়।
“এত মানুষ! এত শব্দ! এত ভিড়!”

কুদ্দুছ হেসে বলল,
“এটাই আমার শহর। কফির দোকানের গরম, রাস্তায় মানুষের কোলাহল, ধুলোমাখা মাটির গন্ধ—সবই আমার পৃথিবী। আর আজ তুমি সেই পৃথিবীর অংশ।”

বাইরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আফরান কাকা ও কুদ্দুছের মা। চোখে জমে থাকা জল লুকোনো গেল না। অ্যামেলিয়ার চোখে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত শান্তি।
“আমি এখন বুঝতে পারছি,” সে বলল,
“যে শান্তি আমি খুঁজছিলাম, তা কোনো অট্টালিকায় নেই। আছে এই মাটির মানুষগুলোর মাঝেই।”

এখানে নেই ক্যাফের ঝকঝকে আলো, নেই সিডনির চকচকে আকাশ। আছে বাংলাদেশের মেঘলা আকাশ, এক পশলা বৃষ্টি আর মানুষের সঙ্গে মাটির নিবিড় সংযোগ। অ্যামেলিয়া হাসল—প্রথমবারের মতো যেন পুরো দমে নিঃশ্বাস নিল।

বাড়িতে পৌঁছে তারা ভাঙাচোরা ঘরের দরজায় দাঁড়াল। কুদ্দুছের মা প্রথমে থমকে গেলেন, তারপর চোখ ভরে উঠল জলে।
“তুমি… তুমি কেমন আছ?” কণ্ঠে কাঁপন।

অ্যামেলিয়া এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।
“আমি ভালো আছি। আর আমি এখানেই থাকতে চাই।”

কুদ্দুছ নিচু স্বরে বলল,
“আমি জানি, সবকিছু সহজ নয়। কিন্তু তুমি পাশে থাকলে, সব বাধাই সহনীয় হয়ে ওঠে।”

বিকেলের আলো এসে পড়ল বারান্দায়। অ্যামেলিয়া চায়ের কাপ হাতে বাইরে তাকিয়ে রইল। আফরান কাজ শেষে ফিরে এসে অবাক হয়ে দেখল—কত সহজে সে এই নতুন জীবনকে আপন করে নিয়েছে।

“তুমি জানো,” আফরান হেসে বলল,
“আমি কখনো ভাবিনি কেউ এত সহজে আমাদের এই ছোট জীবনটাকে বুঝতে পারবে।”

অ্যামেলিয়া মৃদু হেসে বলল,
“আমি শুধু অনুভব করি। আর জানি—আমি এখানে আছি এমন এক ভালোবাসার জন্য, যা সবকিছুর চেয়ে বড়।”

বিকেলের রোদ, চায়ের উষ্ণতা আর ধুলোমাখা বাতাস—সব মিলেমিশে তৈরি করল তাদের ছোট্ট পৃথিবী। কুদ্দুছ আর অ্যামেলিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। সিডনির ঝকঝকে আকাশের চেয়েও বড় এক পৃথিবী গড়ে উঠল তাদের হৃদয়ে—যেখানে ভালোবাসাই সবচেয়ে শক্তিশালী।

“তুমি জানো,” কুদ্দুছ বলল,
“আমি এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এই শহর, এই মাটি, এই মানুষদের মাঝেই আমাদের গল্প লেখা হবে।”

অ্যামেলিয়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
“আমরা একে অপরকে হারাব না। আমাদের পৃথিবী সব বাধা পেরিয়ে যাবে।”

সেদিন বিকেলে মেঘলা আলো, ভেজা মাটির গন্ধ আর চায়ের উষ্ণতা মিলেমিশে তাদের হৃদয়ে এনে দিল এক গভীর শান্তি।

সিডনির ঝকঝকে আকাশ নেই—আছে বাংলাদেশের মেঘলা আকাশ। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে যে ভালোবাসার ঠিকানা, তা কোনো মানচিত্র বা পাসপোর্টে আঁকা যায় না। আমরা নিঃস্ব হতে পারি, তবু আমাদের ভালোবাসা সমুদ্রের মতোই বিশাল।

চলবে…