পর্ব ১০: নতুন জীবন
ঢাকার সকাল ধীরে ধীরে ভোরের আলোয় ভরে উঠছে। মাটির গন্ধ, মানুষের কোলাহল আর ভ্যাপসা গরম—সবকিছুই অ্যামেলিয়ার কাছে নতুন। সে নীরবে তাকিয়ে থাকে। এই শহর, এই মানুষ, এই জীবন—সবই তার সামনে খুলে যাচ্ছে এক নতুন পৃথিবী হিসেবে।
এখানে নেই সিডনির ঝকঝকে আকাশ বা ক্যাফের ঝলমলে আলো। আছে বাংলাদেশের মাটির নরম স্পর্শ, এক পশলা বৃষ্টি আর মানুষের সহজ উষ্ণতা। অ্যামেলিয়ার চোখে আলো ঝলমল করে ওঠে। সে বুঝতে পারে—ভালোবাসা কেবল দু’জন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে গভীর এক সংযোগ।
কুদ্দুছের মা তার হাতে হাত রাখলেন। চোখে জমে উঠল জল।
“তুমি এখানে কী করবে? কেমন থাকবে?” তিনি ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।
অ্যামেলিয়া মৃদু হাসল।
“আমি এখানে আছি। আর এখানেই থাকতে চাই—আপনার ছেলের পাশে।”
কুদ্দুছ শান্ত স্বরে বলল,
“আমাদের নতুন জীবন শুরু হয়েছে। সবকিছু সহজ হবে না, কিন্তু আমরা একে অপরকে হারাব না।”
বিকেলের রোদ এসে পড়ল বারান্দায়। হাতে কফির কাপ নিয়ে অ্যামেলিয়া বসে আছে, নিঃশব্দে বাইরে তাকিয়ে। আফরান কাজ শেষে ফিরে এসে লক্ষ করল—কত সহজে সে এই নতুন জীবনকে আপন করে নিয়েছে।
“আমি কখনো ভাবিনি,” আফরান হেসে বলল,
“কেউ আমাদের এই ছোট জীবনটাকে এত সহজে বুঝে নেবে।”
অ্যামেলিয়া হালকা হেসে উত্তর দিল,
“আমি শুধু অনুভব করি। আর জানি—আমি এখানে আছি এমন এক ভালোবাসার জন্য, যা সবকিছুর চেয়েও বড়।”
বারান্দায় বসে কুদ্দুছ বলল,
“আমরা নিঃস্ব হতে পারি, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসা সমুদ্রের মতোই বিশাল। আমাদের নিজের একটি পৃথিবী তৈরি হয়েছে।”
অ্যামেলিয়া চোখে দৃঢ়তার আলো নিয়ে বলল,
“আমরা একে অপরকে হারাব না। জীবন যত কঠিনই হোক, আমরা একসঙ্গেই থাকব।”
ছোট ছোট সুখের মুহূর্ত—বিকেলের রোদে চা খাওয়া, আঙিনায় বসে গল্প করা, শহরের কোলাহলের মাঝেও একে অপরকে খুঁজে নেওয়া—এসব মিলেই তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে।
কুদ্দুছ হাসতে হাসতে বলল,
“এই শহর, এই মানুষ—সবই আমাদের নতুন জীবন। আর তুমি এখানে আছ, পাশে।”
অ্যামেলিয়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
“আমি জানি। আমরা একে অপরকে হারাব না। আমরা আমাদের ছোট পৃথিবী গড়ে নিয়েছি।”
সেদিন বিকেলে মেঘলা আকাশ, ভেজা মাটির গন্ধ আর চায়ের উষ্ণতা মিলেমিশে তাদের হৃদয়ে এনে দিল এক গভীর শান্তি। তারা বুঝল—প্রাচুর্য, বিলাসিতা কিংবা দূরত্ব কিছুই অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন শুধু চোখে চোখ রাখা, হাতের স্পর্শ আর একে অপরের প্রতি নিঃশর্ত আস্থা।
বাতাসের নরমতা, কফির উষ্ণতা আর ধুলোমাখা মাটির স্পর্শে তৈরি হলো এক অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী। জীবনের এই ছোট সুখগুলোই হয়ে উঠল তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
“আমি কখনো ভাবিনি,” কুদ্দুছ ধীরে বলল,
“আমরা এত সহজভাবে আমাদের পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব। তুমি শুধু ভালোবাসো না, তুমি দেখাও—ভালোবাসা কতটা শক্তিশালী হতে পারে।”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“এটাই আমাদের নতুন সূচনা। আমরা একে অপরকে হারাব না। আমাদের ছোট পৃথিবী টিকে থাকবে।”
রাত নেমে আসে। ঢাকার কোলাহল ধীরে স্তিমিত হয়। তারা বারান্দায় বসে—হাতে হাত ধরে, চোখে চোখ রেখে, নীরবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“আজ থেকে আমাদের জীবন একসঙ্গে,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল।
“ঝুঁকি যত বড়ই হোক, ভালোবাসা সব বাধা পেরিয়ে যাবে।”
অ্যামেলিয়া মৃদু হাসল।
“আমি জানি। আমরা একে অপরকে হারাব না।”
নতুন জীবন, নতুন শুরু—চোখে চোখ রাখা, হাত ধরে থাকা। আমরা নিঃস্ব হতে পারি, কিন্তু হৃদয়ে আমাদের ভালোবাসা সমুদ্রের মতোই বিশাল।
চলবে…