পর্ব ১১: বারান্দার গল্প
ঢাকার বিকেল। ধীরে বয়ে যাচ্ছে রোদ, বাতাসে মাটির গন্ধ আর শহরের কোলাহলের মৃদু মিশ্রণ। কুদ্দুছ ও অ্যামেলিয়া বারান্দায় বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ, পাশে ছোট্ট একটি টেবিল। শহরের ভিড় তাদের কাছে দূরের শব্দমাত্র—তারা দু’জন ব্যস্ত নিজেদের ছোট জগতে।
“দেখছ?” কুদ্দুছ বলল,
“এই শহরের কোলাহল, মেঘলা আলো—সবকিছু যেন একটা গল্প বলছে।”
অ্যামেলিয়া চোখ মেলে চারপাশে তাকাল।
“তুমি সবকিছুর মধ্যেই গল্প খুঁজে পাও। কীভাবে?”
কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল,
“কারণ প্রতিটি মুহূর্তই একটা গল্প। বর্ষার বৃষ্টি, বিকেলের রোদ, চায়ের কাপ—সব মিলেই ছোট ছোট গল্প তৈরি হয়।”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“তাহলে আজকের গল্পটা কী?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে উত্তর দিল,
“আজকের গল্প আমাদের নতুন জীবন—ছোট সুখ আর এই শান্ত মুহূর্ত, যেখানে আমরা একসঙ্গে আছি।”
বারান্দায় হালকা শীতল বাতাস বইতে থাকে। তারা নীরবে একে অপরের দিকে তাকায়—কথার প্রয়োজন হয় না, চোখেই সব বোঝা যায়।
“আমি ভাবছিলাম,” অ্যামেলিয়া বলল,
“যে পৃথিবী আমি পেছনে ফেলে এসেছি—সিডনির আকাশ, প্রাচুর্য, সবকিছু—ওগুলো কি একদিন মনে পড়বে?”
কুদ্দুছ হেসে বলল,
“হয়তো পড়বে। কিন্তু তুমি যে এই মাটির মানুষের মাঝে, এই সহজ জীবনের ভেতর ছোট সুখ বেছে নিয়েছ—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
এক ঝাপটা বাতাস বয়ে যায়। অ্যামেলিয়ার চুল নড়ে ওঠে। কুদ্দুছ তার হাত ধরে বলে,
“দেখছ? ছোট ছোট জিনিসই আসল আনন্দ দেয়।”
অ্যামেলিয়ার চোখে উজ্জ্বলতা।
“আমি জানি। আজ বুঝতে পারছি—সুখ বড় প্রাচুর্যে নয়, ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে। তোমার হাত ধরে চা খাওয়া, বারান্দায় বসে গল্প করা, এই শহরের কোলাহল শোনা—এই মুহূর্তগুলোই আমার বড় সুখ।”
তাদের কথোপকথন সংক্ষিপ্ত, সরল—তবু গভীর। চায়ের উষ্ণতা আর বাতাসের নরম ছোঁয়ায় যেন তাদের চারপাশে গড়ে ওঠে এক আলাদা পৃথিবী।
কুদ্দুছ নিচু স্বরে বলল,
“আমরা নিঃস্ব হতে পারি, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসা সমুদ্রের মতোই বিশাল।”
অ্যামেলিয়া মৃদু হেসে বলল,
“আমরা একে অপরকে হারাব না। জীবন যত কঠিনই হোক, আমরা একসঙ্গেই থাকব।”
ঠিক তখনই কাজ শেষে আফরান বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হেসে বলল,
“দেখছি, তোমরা একে অপরের সঙ্গে বেশ মানিয়ে গেছ। এই শহরের গরম আর কোলাহলও যেন তোমাদের গল্পের অংশ হয়ে গেছে।”
কুদ্দুছ হাসল।
“হ্যাঁ, আমরা প্রতিদিনই গল্প তৈরি করি—ছোট, সাধারণ, কিন্তু একেবারে সত্যি।”
অ্যামেলিয়ার চোখে একরাশ উচ্ছ্বাস।
“আমি জানি, আমরা শুধু ভালোবাসছি না—আমরা আমাদের নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলছি।”
সেদিন বিকেলে মেঘলা আকাশ, ভেজা মাটির গন্ধ আর চায়ের উষ্ণতা মিলেমিশে তাদের মনে এনে দিল এক গভীর শান্তি। তারা বুঝল—সুখ কোনো বড় কিছু নয়, সে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তের ভেতর।
“আজকের গল্প,” কুদ্দুছ বলল,
“চোখে চোখের এই নীরবতা, বারান্দার আলো আর চায়ের কাপ—সব মিলেই লেখা হয়ে গেছে।”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“এটাই আমাদের নতুন সূচনা। আমরা একে অপরকে হারাব না। আমাদের ছোট পৃথিবী টিকে থাকবে।”
রাত নামে। ঢাকার কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়। তারা বারান্দায় বসে থাকে—হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ মিলিয়ে। নীরবতায় তারা বুঝে যায়—এই শহরের, এই মাটির, এই মানুষের মাঝেই সত্যিকারের সুখ লুকিয়ে আছে।
শেষ লাইন:
“বারান্দার গল্প, ছোট ছোট মুহূর্ত আর চোখে চোখের নীরব ভাষা—সব মিলেই গড়ে উঠল তাদের নতুন পৃথিবী, যেখানে ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি।”
চলবে…