ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৩:০৩ AM

প্রথম পরিচয়-১৩

মান্নান মারুফ
16-01-2026 01:06:56 PM
প্রথম পরিচয়-১৩

পর্ব ১৩: বিচ্ছেদ

ঢাকার সকাল। ভোরের আলো ফোঁটাতে শুরু করেছে। আকাশ মেঘলা, হালকা হাওয়া বইছে। কুদ্দুছ জানে, আজকের দিন তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটি। সিডনিতে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে। তার ভিসা, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা তাকে ডেকে চলছে।

অ্যামেলিয়াও বুঝে—আজকের এই মুহূর্ত তাদের নতুন জীবন ও ভালোবাসার এক পরীক্ষা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে, হাতে চা নিয়ে, তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে মিলছে আবেগ, ভালোবাসা এবং বিদায়ের অদ্ভুত দমবন্ধ মুহূর্ত।

“কুদ্দুছ,” অ্যামেলিয়ার কণ্ঠে কেঁপে ওঠা আবেগ।
“আমি জানি, আজকে আমরা দূরে যাচ্ছি,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল।

অ্যামেলিয়া চোখে জল ধরে বলল,
“আমি চাই তুমি জানো—তুমি শুধু আমার হৃদয়ে থাকো। দূরত্ব আমাদের ভালোবাসাকে ভাগ করতে পারবে না।”

কুদ্দুছ তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আমি জানি। মনে হয়, এই বিদায় আমাদের প্রেমের শক্তি আরও দৃঢ় করবে। তুমি আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও ভয় পাব না।”

রাস্তায় হালকা কোলাহল, মানুষের ভিড়। কিন্তু তাদের চোখে শুধুই একে অপর। দীর্ঘ নিঃশ্বাসের পর, কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল,
“যদি পৃথিবী আমাদের একসাথে রাখে না, আমরা নিজেরাই এক পৃথিবী বানাব।”

অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত শক্তি।
“আমি জানি। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব, যতদিনই হোক।”

সেদিন সকালে, কুদ্দুছ তার ব্যাগ হাতে, অ্যামেলিয়ার হাত ধরে দাঁড়াল। দু’জনের চোখে অদ্ভুত দমবন্ধ আবেগ।

“তুমি জানো,” কুদ্দুছ বলল,
“সিডনির ঝকঝকে আকাশ, বিলাসী জীবন—সব কিছু মনে পড়বে। কিন্তু আমাদের আসল পৃথিবী এই শহরের মাটির মাঝে, আমাদের ভালোবাসার মধ্যে।”

অ্যামেলিয়া হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“আমি জানি। তুমি ফিরে গেলে আমাদের হৃদয়ের ছায়া সবসময় থাকবে। আমি সেই ছায়ায় টিকে থাকব।”

বিমানবন্দরের পথে, কুদ্দুছের হৃদয় দ্রুত ধড়ফড় করছে। ভিসার ঝুঁকি, পড়াশোনা—সবই এখন বাস্তব। তবে অ্যামেলিয়ার হাত ধরা, চোখে চোখ মিলানো—সবকিছুই বড় সাহস যোগাচ্ছে।

“ভয় পেও না,” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল।
“আমি জানি,” কুদ্দুছ বলল। “কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমার মন শান্ত হবে না।”

বোর্ডিং গেটে পৌঁছালে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে শেষ মুহূর্তের হাসি বিনিময় করল। কেবল হাতের স্পর্শ, কেবল চোখে চোখ—শব্দ নয়, অনুভূতি।

“যদি পৃথিবী আমাদের জায়গা না দেয়,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল,
“আমরা নিজেরাই এক পৃথিবী তৈরি করব।”

অ্যামেলিয়ার চোখে জল, তবে মুখে শান্তি।
“আমি জানি। আমি দেখব তোমাকে কিভাবে।”

বিমানে ওঠার সময় তারা শেষবার একে অপরের দিকে তাকাল। কুদ্দুছের মনে হল—এই মুহূর্ত যেন এক যুদ্ধ জয় করা, স্বাধীনতার যুদ্ধ। এটি নিজের জীবন নয়, একে অপরের জীবন স্বাধীন করার মুহূর্ত।

বিমানের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কুদ্দুছ জানে, দূরত্ব শুরু হয়েছে, তবে হৃদয়ে এক অদৃশ্য বন্ধন—ছায়ার মতো দৃঢ়।

ঢাকায় ফিরে থাকা অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত শান্তি। সে জানে—কুদ্দুছ ফিরে যাবে, কিন্তু তাদের ভালোবাসার স্থান পৃথিবীর কোনো মানচিত্র দিয়ে কেনা যাবে না।

সেদিন বিকেলে, ঢাকার আকাশ মেঘলা, হালকা বৃষ্টি। অ্যামেলিয়া বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে। কুদ্দুছের মুখোমুখি স্মৃতি, হাতের স্পর্শ, চোখে চোখ—সবই মনে পড়ছে।

“আমি জানি,” সে ফিসফিস করে বলল,
“আমরা একে অপরকে হারাব না। দূরত্ব কিছুই করতে পারবে না।”

বারান্দার আলো, মাটির ঘ্রাণ, শহরের কোলাহল—সব মিলেমিশে সেই বিদায়কে স্মৃতি হিসেবে রূপান্তরিত করল। তারা বুঝল—ভালোবাসা নিঃশ্বাস, হাতের স্পর্শ, চোখে চোখ—এগুলোই সবচেয়ে বড় শক্তি।


“বিদায় হলেও, আমাদের হৃদয়ে ভালোবাসার ছায়া চিরকাল থাকবে। আমরা দূরে, তবে একে অপরের সঙ্গে এক পৃথিবী তৈরি করেছি—যেখানে ভালোবাসা সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী।”