ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:০৬:৩৬ AM

উপন্যাস: এক থাপ্পর

মান্নান মারুফ
04-03-2026 01:19:07 PM
উপন্যাস: এক থাপ্পর

পর্ব–২

অফিসে এসে মিতু কোনোভাবেই কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে পারছিল না।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে খোলা ফাইলগুলো ঝাপসা লাগছিল। অক্ষরগুলো যেন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে অদ্ভুত এক অস্পষ্টতায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। পাশে বসা সহকর্মী দু’বার ডেকে উঠল—“মিতু, রিপোর্টটা পাঠিয়েছ?”—সে চমকে উঠল, যেন দূর কোনো ঘোর থেকে ফিরে এলো।

তাজুলের মুখে রাতে অমন বিশ্রী কথাবার্তা শুনে মিতু বাকরুদ্ধ।
কথাগুলো কানে বাজছিল—অভিযোগ, অবিশ্বাস, অপমান।
“তুমি কিছু বোঝো না।”
“তোমার জন্যই সবকিছু জটিল হয়ে যায়।”
এই বাক্যগুলোই কি সেই মানুষটির মুখে মানায়, যে একদিন বলেছিল—“তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ”?

আর তার চেয়েও বড় ধাক্কা—
তাজুল মিতুর গায়ে হাত তুলবে, এটা তো তার কল্পনাতেই ছিল না কখনও।

তিন বছর ধরে সে বিশ্বাস করে এসেছে, তাদের সম্পর্কের ভিত শক্ত। ঝড় আসবে, কিন্তু ঘর ভাঙবে না। অথচ আজ মনে হচ্ছে, সেই ভিতের কোথাও চিড় ধরেছে—যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাঙন শুরু করে দিয়েছে।

কার কাছে শেয়ার করবে এসব কথা মিতু?
মায়ের কাছে?
বন্ধুর কাছে?
সহকর্মীর কাছে?

মনের ভিতর অনেক কষ্ট। কিন্তু যত যাই হোক, ঘরের কথা বাইরে তো আর বলা যায় না।
এই শিক্ষাই তো সে ছোটবেলা থেকে পেয়েছে—সংসারের মান-সম্মান নারীর হাতে। স্বামীর ভুল ঢেকে রাখা, অপমান গিলে ফেলা, চোখের জল লুকিয়ে রাখা—এসবই নাকি একজন ভালো স্ত্রীর গুণ।

মিতু জানে না, সে ভালো স্ত্রী কি না।
শুধু জানে, সে আজ খুব একা।

সকালের পর থেকে দুপুর পর্যন্ত শুধু ভাবনাতেই কেটে গেল তার সময়। কীবোর্ডে আঙুল চলছিল, কিন্তু মাথার ভেতর ঘুরছিল গত রাতের দৃশ্য। সেই থাপ্পড়ের শব্দ যেন এখনো তার কানে বাজছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, গালে আবার জ্বালা করছে।

আজ সে বাসা থেকে খাবার নেয়নি।
সকালে রাগে, অপমানে, অভিমানে সে রান্নাঘরে ঢোকেনি। চুলায় হাঁড়ি চড়েনি। তাজুলও কিছু বলেনি। দু’জনেই নীরব।

অফিসের ক্যান্টিনে গিয়ে সে খাবার নিল। ভাত, ডাল, ডিমভাজি। সাধারণ, নীরস খাবার।
চামচ দিয়ে ভাত নাড়তে নাড়তে তার মনে হলো—এই প্রথম সে সংসারের নিয়ম ভাঙল।

বেশ কিছু অভিজ্ঞতা এই প্রথমবার হচ্ছে মিতুর।

স্বামীর হাতে প্রথম চড় খাওয়া।
রাগ করে ভাত খাওয়া বন্ধ করা।
সকালে উঠে রান্না না করা।
অফিসে খাবার না নিয়ে আসা।

এই ‘প্রথম’গুলো তার জীবনের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা হয়ে থাকছে।
প্রথম আঘাত, প্রথম প্রতিবাদ, প্রথম নীরব বিদ্রোহ।

ক্যান্টিনের ভিড়ের মাঝেও সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করছিল। চারপাশে হাসাহাসি, গল্পগুজব—সবকিছু যেন অন্য এক জগতের। তার জগত এখন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে একটি শব্দে—“কেন?”

কেন তাজুল এমন করল?
কেন সে এত রেগে গেল?
কেন সে নিজেকে সামলাতে পারল না?

আবার প্রশ্নটা নিজের দিকেও ফিরে আসে—
সে কি সত্যিই কিছু ভুল বলেছিল?

এই আত্মসমালোচনার চক্রে ঘুরতে ঘুরতে মিতু ক্লান্ত হয়ে পড়ে। হঠাৎ তার মনে হলো—কেন সবসময় নারীকেই নিজের ভুল খুঁজতে হয়? কেন স্বামীর রাগের দায়ও স্ত্রীর কাঁধে এসে পড়ে?

বিকেলে কাজের ফাঁকে সে মোবাইল বের করল। তাজুলের কোনো মেসেজ নেই।
একটা ছোট্ট “সরি” লিখতে কি খুব কষ্ট হয়?

তার মনে হলো, হয়তো তাজুল ভেবেছে—একটা থাপ্পড় তেমন কিছু নয়। সংসারে এসব হয়।
কিন্তু মিতুর কাছে এটা শুধু থাপ্পড় নয়। এটা তার অস্তিত্বে আঘাত।

বিকেলের আলো ফুরিয়ে এলো। অফিস ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে তার বুক ধড়ফড় করছিল। আজ কি কথা হবে? নাকি আবার নীরবতা?

বাসায় ঢুকে সে দেখল, ঘর গুছানো। টেবিলের ওপর এক প্যাকেট খাবার রাখা। হয়তো তাজুল বাইরে থেকে এনেছে।
এই ছোট ছোট যত্নগুলোই তো একসময় তাকে গলিয়ে দিত।
আজ কেন পারছে না?

তাজুল ঘরেই ছিল। চোখাচোখি হতেই দু’জনেই থেমে গেল।
কিছু বলার ছিল, কিন্তু ভাষা নেই।

মিতু নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ রাখল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখল। গালে দাগ নেই, কিন্তু চোখের গভীরে একটা ছাপ রয়ে গেছে।
সে মনে মনে ভাবল—শরীরের ক্ষত সেরে যায়, কিন্তু মনের ক্ষত?

রাতের খাবার দু’জনে চুপচাপ খেল। তাজুল কয়েকবার তাকাল, যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু শব্দগুলো বেরোল না।

খাওয়ার পর মিতু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসে হালকা শীত। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু মেঘ।

তার মনে হলো, সম্পর্কও কখনো কখনো এমনই—চাঁদ আছে, কিন্তু মেঘে ঢাকা।
মেঘ সরে গেলে কি আবার আলো ফিরবে?

পেছন থেকে তাজুলের কণ্ঠ এলো, “মিতু…”

সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

তাজুল বলল, “আমি জানি, তুমি কষ্ট পেয়েছ। আমিও শান্তিতে নেই।”

মিতু শান্ত গলায় বলল, “কষ্ট তো আমিও পেয়েছি। কিন্তু সেই কষ্টের ওজন তুমি বুঝবে কি?”

তাজুল চুপ করে রইল।

মিতু অনুভব করল, তার ভেতরে কিছু বদলে যাচ্ছে। আগের মতো কান্না পাচ্ছে না। বরং একটা দৃঢ়তা জন্ম নিচ্ছে—নিজেকে আর অবহেলা করতে দেবে না।

আজকের দিনটা তাকে শিখিয়েছে—
নীরব থাকা মানেই মেনে নেওয়া নয়।
রাগ করে ভাত না খাওয়া ছোট ঘটনা হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে জমে থাকে আত্মসম্মানের প্রশ্ন।

রাত গভীর হলো।
বিছানায় শুয়ে মিতু ভাবল, এই সম্পর্ককে বাঁচাতে হলে দু’জনেরই বদলাতে হবে। শুধু ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়, আচরণও বদলাতে হবে।

সে জানে না আগামীকাল কী হবে।
তবে আজ সে বুঝেছে—একটা থাপ্পড় শুধু হাতের আঘাত নয়, এটা সম্পর্কের পরীক্ষাও।

সে চোখ বন্ধ করল।
হয়তো আগামীকাল নতুন কিছু শুরু হবে।
হয়তো না।

কিন্তু আজকের অভিজ্ঞতাগুলো—
প্রথম চড়, প্রথম না খাওয়া সকাল, প্রথম রান্নাহীন দিন—
তাকে আর আগের সেই সরল, নির্ভার মিতু থাকতে দেবে না।

তার ভেতরে এক নতুন মিতুর জন্ম হচ্ছে—
যে কাঁদে, কষ্ট পায়, কিন্তু ভাঙে না।

চলবে…