ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:০৪:০৪ PM

ক্রীড়া পরিষদে দুর্নীতির কালো ছায়া পড়েছে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
05-08-2026 07:55:56 PM
ক্রীড়া পরিষদে দুর্নীতির কালো ছায়া পড়েছে

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি) দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক সুবিধা, কেনাকাটা, বদলি, তথ্য পাচার এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডে অনিয়মের অভিযোগ এনে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে পরিষদের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করা হয়। তাদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিবর্তনের পরও ওই বলয় সক্রিয় থেকে নতুন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমানে বিএনপির সমর্থক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছেন এবং প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করছেন।

ডেসপাচ রাইডার আবদুল মালেককে ঘিরেও একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি দুর্নীতি, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো, তথ্য পাচার এবং কেনাকাটাসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ছিলেন। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অবসর-পূর্ব ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার পরও তাকে মৌখিক নির্দেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরকারি বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকৌশল শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে আবদুল মালেককে ব্যবহার করে বিভিন্ন গোপন তথ্য বাইরে পাচার এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্লাস্টিকের ফুল, টব ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, জাল সনদের অভিযোগ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির রয়েছে। এছাড়া নারীসংক্রান্ত অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার সরকারি নথিপত্র বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনের সময় যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের এক কর্মচারী দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে তিনি নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপন করছেন।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু কর্মকর্তা অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

উচ্চমান সহকারী এস এম ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধেও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা স্টেডিয়ামের পুরোনো মালামাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির শিকার ব্যক্তিরা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে এস এম ইদ্রিস আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ফতুল্লা স্টেডিয়ামের পুরোনো মালামাল বিক্রির অর্থ তিনি গ্রহণ করেননি; অন্য একজন কর্মকর্তা বিষয়টি পরিচালনা করেছেন। জাতীয় স্টেডিয়ামে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের জন্য কঠিন এবং মাঝে মধ্যে দলীয় কর্মসূচিতে অনুদান পাওয়া যায়। নিজের সম্পদের বিষয়ে তিনি বলেন, পূর্বের একটি বাড়ি বিক্রি করে প্রায় দুই বছর আগে ব্যক্তিগত অর্থে নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

অভিযোগে পরিষদের পুরোনো ভবনের ক্যান্টিন পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বল্পমূল্যে মানসম্মত খাবার সরবরাহের পরিবর্তে নিম্নমানের খাবার উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ ক্যান্টিন পরিচালনায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ব্যয় পরিষদ বহন করছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়মের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন, এসব বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। তারা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। তাদের প্রত্যাশা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ক্রীড়া প্রশাসন গড়ে উঠবে, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও খেলোয়াড়দের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।