ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৫:৫০:২০ PM

প্রেম অমর

মান্নান মারুফ
02-04-2026 03:28:51 PM
প্রেম অমর
পর্ব–৩
রাতটা যেন অন্য সব রাতের চেয়ে আলাদা ছিল।
আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। পুকুরের জল অস্থির—যেন প্রকৃতিও অনুভব করছে কোনো অজানা সত্য প্রকাশের মুহূর্ত।
রায়হান হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল মাটিতে। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অচেনা অথচ অদ্ভুত পরিচিত কিছু দৃশ্য—
একটা পুরনো কাঁচা রাস্তা…
একটা নৌকা ঘাটে বাঁধা…
একটা যুবক দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে অপেক্ষা…
আর তার দিকে দৌড়ে আসছে এক মেয়ে—নীল শাড়ি পরা…
“নীলাঞ্জনা…”
রায়হানের ঠোঁট থেকে নিজে থেকেই বেরিয়ে এল নামটা।
নীলাঞ্জনা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে বিস্ময়, আবেগ, আর এক অজানা আশঙ্কা।
“তুমি… কি দেখছো?”—তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
রায়হান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে এখন আর শুধু বর্তমানের রায়হান নেই—সেখানে যেন অন্য একজনের ছায়া ভেসে উঠেছে।
“আমি… আমি সেই ছেলেটাকে দেখছি…”
সে বলল, “যে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল…”
নীলাঞ্জনার নিঃশ্বাস থেমে গেল যেন।
“তার নাম… কি মনে পড়ছে?”
রায়হান চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর—
“আরিফ…”
শব্দটা বেরিয়ে এল গভীর কোথাও থেকে।
এক মুহূর্তে চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
নীলাঞ্জনার চোখ ভিজে উঠল।
“আরিফ…”—সে ফিসফিস করে বলল, “এটাই তো তার নাম ছিল…”
রায়হান চোখ খুলল।
“তাহলে… আমি-ই কি সেই আরিফ?”
নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল তার দিকে।
তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন বহুদিনের অপেক্ষার শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
“আমি জানতাম… একদিন তুমি ফিরবে,”
সে বলল, “সময় বদলাবে, জীবন বদলাবে… কিন্তু প্রেম বদলাবে না।”
রায়হানের বুকের ভেতর কেমন যেন ধকধক করতে লাগল।
“কিন্তু আমি তো সব ভুলে গিয়েছিলাম…”
“এটাই তো নিয়ম,”—নীলাঞ্জনা মৃদু হেসে বলল—
“নতুন জন্ম মানে নতুন শুরু। কিন্তু কিছু অনুভূতি… কিছু বন্ধন… কখনো মুছে যায় না।”
হঠাৎ আবার সেই দৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল—
আরিফ দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে…
সে অপেক্ষা করছে…
রাত বাড়ছে…
কিন্তু নীলাঞ্জনা আসছে না…
তারপর—
একটা চিৎকার…
মানুষের ভিড়…
একটা নিথর দেহ…
রায়হান চমকে উঠে চোখ খুলল।
“তুমি… সেদিন… পৌঁছাতে পারোনি…”
তার গলা ভারী হয়ে গেল।
নীলাঞ্জনা মাথা নিচু করল।
“আমি চেষ্টা করেছিলাম… কিন্তু ভাগ্য…”
“আর আমি?”—রায়হান জিজ্ঞেস করল।
নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে বলল—
“তুমি সারা রাত অপেক্ষা করেছিলে। তারপর যখন খবরটা পেলে…”
সে থেমে গেল।
“তারপর?”—রায়হান উৎকণ্ঠায় বলল।
“তুমি আর বাঁচতে চাওনি,”
নীলাঞ্জনার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল,
“তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলে… আর কিছুদিন পর… তুমি-ও চলে গেলে।”
রায়হান নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তার মনে হচ্ছিল—এই গল্পটা সে শুধু শুনছে না, সে যেন আবার বাঁচছে।
“তাহলে… আমাদের প্রেম শেষ হয়ে গিয়েছিল?”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
“না… শেষ হয়নি। তাই তো আমি এখনো এখানে… আর তুমি আবার ফিরে এসেছো।”
হঠাৎ দূরে বজ্রপাত হলো। আলো ঝলসে উঠল আকাশে।
কুদ্দুস আবার এসে দাঁড়িয়েছে বটগাছের পাশে।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
“সব মনে পড়েছে?”—সে শান্ত কণ্ঠে বলল।
রায়হান তাকাল তার দিকে।
“তুমি… সব জানো?”
কুদ্দুস মৃদু হাসল।
“আমি শুধু দেখেছি… বহু বছর ধরে।”
“কি দেখেছো?”—রায়হান জিজ্ঞেস করল।
“দেখেছি—একটা প্রেম, যেটা মৃত্যু মানেনি,”
কুদ্দুস বলল,
“দেখেছি—একটা আত্মা, যেটা অপেক্ষা করেছে… আরেকটা আত্মার জন্য।”
রায়হান আর নীলাঞ্জনা একে অপরের দিকে তাকাল।
“কিন্তু এখন কি হবে?”—রায়হান প্রশ্ন করল।
কুদ্দুস আকাশের দিকে তাকাল।
“এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্তের।”
“কিসের সিদ্ধান্ত?”
“তোমরা কি এই জন্মেও একসাথে থাকতে পারবে… নাকি আবার আলাদা হয়ে যাবে।”
রায়হানের বুক কেঁপে উঠল।
“আমরা কি একসাথে থাকতে পারব?”—সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল।
নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
“আমি এই জগতে পুরোপুরি থাকতে পারি না… আমি শুধু এক ছায়া… এক অনুভূতি…”
“না!”—রায়হান হঠাৎ বলে উঠল—
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না… আবার না…”
তার কণ্ঠে ছিল তীব্র আকুলতা।
নীলাঞ্জনা তার কাছে এগিয়ে এল।
তার হাত রায়হানের মুখ ছুঁয়ে গেল—কিন্তু সেই ছোঁয়া ছিল হালকা, প্রায় অনুভূতিহীন।
“প্রেম মানে সবসময় একসাথে থাকা নয়…”
সে বলল,
“কখনো কখনো… ছেড়ে দেওয়াটাই সত্যিকারের ভালোবাসা।”
রায়হানের চোখে জল এসে গেল।
“আমি পারব না…”
“পারতেই হবে,”—নীলাঞ্জনার কণ্ঠ নরম কিন্তু দৃঢ়—
“কারণ এবার তোমার বাঁচার সময়… আর আমার মুক্তির।”
“মুক্তি?”—রায়হান বিস্মিত।
“হ্যাঁ… আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি… শুধু তোমার জন্য,”
নীলাঞ্জনা বলল,
“এখন যদি তুমি আমাকে মুক্তি দাও… তাহলে হয়তো আমি শান্তি পাবো।”
চারদিকে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল।
রায়হান বুঝতে পারছিল—এটাই সেই মুহূর্ত, যেটা তার জীবন বদলে দেবে।
সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তার হৃদয়ের ভেতরে একদিকে তীব্র ভালোবাসা…
অন্যদিকে হারানোর ভয়…
আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে—
অমর প্রেমের চূড়ান্ত পরীক্ষা।
দূরে আবার কুদ্দুসের কণ্ঠ ভেসে এল—
“প্রেম কখনো মরে না… শুধু রূপ বদলায়…”
রায়হান চোখ খুলল।
সে জানে—এবার তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
চলবে…