ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৫:৫২:০২ PM

প্রেম অমর

মান্নান মারুফ
02-04-2026 03:30:00 PM
প্রেম অমর
 
শেষ পর্ব
রাতটা যেন থেমে আছে।
সময় যেন নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে রায়হানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে রায়হান অনুভব করছিল—এই মুহূর্ত শুধু তার জীবনের নয়, বহু জন্মের এক অসমাপ্ত গল্পের শেষ অধ্যায় হতে চলেছে।
নীলাঞ্জনা তার সামনে দাঁড়িয়ে।
মুখে শান্তি, কিন্তু চোখে এক গভীর আকুতি—
মুক্তির আকুতি।
“রায়হান…”
তার কণ্ঠ ছিল নরম, যেন বাতাসের স্পর্শ,
“তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো… তবে আমাকে যেতে দাও।”
এই কথাটা যেন ছুরির মতো বিঁধল রায়হানের হৃদয়ে।
“তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে বলছো?”—তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
“না…”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল,
“আমি চাই—তুমি আমাকে মুক্ত করো।”
রায়হান চোখ বন্ধ করল।
তার মনে পড়ছে সব—
এই জন্মের প্রতিটি মুহূর্ত…
আর সেই পূর্বজন্মের অসমাপ্ত ভালোবাসা…
“আমি আবার তোমাকে হারাতে চাই না…”
“তুমি আমাকে হারাবে না,”—নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে বলল,
“কারণ আমি কখনো তোমার থেকে আলাদা ছিলাম না… আর হবোও না।”
কুদ্দুস একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
তার চোখে ছিল এক গভীর নিশ্চিন্ততা—যেন সে জানে, এই গল্পের শেষটা কীভাবে হবে।
“প্রেমকে আঁকড়ে ধরে রাখা যায় না,”
হঠাৎ সে বলে উঠল,
“প্রেমকে মুক্তি দিতে হয়… তবেই সে অমর হয়।”
রায়হান ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকাল—এইবার অন্যভাবে।
আর শুধু তাকে নিজের কাছে রাখার ইচ্ছা নয়…
বরং তাকে শান্তি দেওয়ার ইচ্ছা।
“তুমি কি সত্যিই মুক্তি পাবে… যদি আমি তোমাকে ছেড়ে দিই?”
নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ… কারণ আমার অপেক্ষা শুধু তোমার জন্যই ছিল।
তুমি আমাকে চিনেছো… মনে রেখেছো… ভালোবেসেছো…
এটাই আমার পূর্ণতা।”
রায়হানের চোখে জল এসে গেল।
“তাহলে… তুমি কি আর কখনো ফিরে আসবে না?”
নীলাঞ্জনা একটু থামল।
তারপর বলল—
“প্রেম কখনো চলে যায় না…
শুধু তার রূপ বদলায়।
আমি হয়তো আর এইভাবে আসব না…
কিন্তু তুমি আমাকে খুঁজে পাবে—
হাওয়ায়… স্মৃতিতে… তোমার হৃদয়ের গভীরে…”
রায়হান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
“আমি তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি…”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু দৃঢ়।
এক মুহূর্তে চারপাশের বাতাস বদলে গেল।
পুকুরের জল শান্ত হয়ে এল।
আকাশের মেঘ সরে গিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি দিল।
নীলাঞ্জনার শরীর থেকে যেন এক অদ্ভুত আলো বের হতে লাগল।
সে এগিয়ে এসে রায়হানের কপালে হালকা করে স্পর্শ করল।
এইবার সেই স্পর্শ বাস্তবের মতোই অনুভূত হলো—উষ্ণ, জীবন্ত।
“ধন্যবাদ…”
সে ফিসফিস করে বলল।
রায়হান চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হচ্ছিল—তার ভেতরের একটা অংশ যেন ভেঙে যাচ্ছে… আবার গড়ে উঠছে নতুন করে।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি…”—সে বলল।
নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।
“আমি জানি… আর এই ভালোবাসাই আমাকে মুক্তি দিচ্ছে।”
ধীরে ধীরে তার অবয়ব ঝাপসা হতে লাগল।
“রায়হান…”
শেষবারের মতো ডাকল সে।
“হ্যাঁ?”
“এই জীবনে… বেঁচে থেকো।
শুধু আমার জন্য নয়… নিজের জন্যও।”
তারপর—
সে মিলিয়ে গেল।
পুরোপুরি।
চারদিকে শুধু নীরবতা।
রায়হান দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ।
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল… কিন্তু সেই চোখে এক অদ্ভুত শান্তিও ছিল।
কুদ্দুস ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল।
“শেষ হলো?”—সে জিজ্ঞেস করল।
রায়হান মাথা নাড়ল।
“না… শেষ না।
শুধু… বদলে গেল।”
কুদ্দুস হেসে বলল—
“এটাই তো প্রেমের আসল রূপ।”
ভোর হতে শুরু করেছে।
পূর্ব আকাশে আলো ফুটছে।
রায়হান ধীরে ধীরে কবরটার দিকে এগিয়ে গেল।
দেখল—পুরনো, ভাঙা শিলালিপিটা আর আগের মতো নেই।
তাতে যেন নতুন করে লেখা হয়েছে—
“নীলাঞ্জনা — শান্তিতে”
রায়হানের মুখে এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে বুঝতে পারল—
প্রেম মানে শুধু পাওয়া নয়…
প্রেম মানে মুক্তি দেওয়া…
প্রেম মানে অমর হয়ে থাকা, রূপ বদলে।
সে আকাশের দিকে তাকাল।
হালকা বাতাস বইছে…
আর সেই বাতাসে ভেসে আসছে এক পরিচিত অনুভূতি—
নীলাঞ্জনা আর নেই…
তবুও সে আছে।
রায়হান ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল নতুন জীবনের পথে।
তার হৃদয়ে এখন কোনো শূন্যতা নেই—
বরং আছে এক অমর ভালোবাসার আলো।
আর দূরে কোথাও, অদৃশ্য এক জগতে—
একটি আত্মা অবশেষে পেয়েছে তার মুক্তি।
সমাপ্ত।