ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৮:০৬:৩২ PM

মূর্ছনায় মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে কণ্ঠশিল্পী ‘টুকটুকি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
02-07-2026 06:39:54 PM
মূর্ছনায় মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে কণ্ঠশিল্পী ‘টুকটুকি

সংগীতের সুর আর মাটির গন্ধে মিশে থাকে বাউল গান। আর সেই সুরের মূর্ছনায় মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সংগীতপিপাসু লাখো মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন তরুণ শিল্পী সুমাইয়া সিকদার, যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘টুকটুকি বাউল’ নামে পরিচিত। ফরিদপুর জেলার ইশান গোপালপুর গ্রামের এই মেধাবী শিল্পী তার দরদভরা কণ্ঠের মাধ্যমে বাউল ও লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।
​সংগীতের হাতেখড়ি ও অনুপ্রেরণা
তিন বোনের মধ্যে সবার বড় টুকটুকি। সংগীতের প্রতি তার এই গভীর অনুরাগ মূলত পারিবারিক আবহ থেকে পাওয়া। তার বাবা মো. টোকোন সিকদার ও মা রোজিনা বেগমের আজন্ম স্বপ্ন ছিল, তাদের মেয়ে একদিন দেশের সীমানা পেরিয়ে বড় শিল্পী হবে। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই খুব ছোটবেলা থেকে সংগীতের জগতে হাতেখড়ি টুকটুকির।
​এ বিষয়ে টুকটুকি বাউল আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার বাবা-মায়ের স্বপ্নই আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা। ছোটবেলায় যখনই সুরের টান অনুভব করেছি, বাবা আমার পাশে থেকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। গান শুধু আমার নেশা নয়, গানেই আমি প্রকৃত শান্তি খুঁজি। মানুষের ভালোবাসার যে সাগরে আমি ভেসেছি, তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি চাই আমার গানের মধ্য দিয়ে লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং সব বয়সী মানুষের হৃদয়ে নিজের একটি স্থায়ী জায়গা তৈরি করতে।”
​সংগ্রামের গল্প: মঞ্চে দীর্ঘ প্রতীক্ষা
টুকটুকির পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। সংগীতের প্রতি প্রবল টান থাকলেও তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এমন অনেক রাত গেছে, যখন মঞ্চে দীর্ঘ সময় বসে থেকেও গান গাওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। অনেক ক্ষেত্রে আয়োজকদের অবহেলায় গান না গেয়েই ফিরতে হয়েছে তাকে। কিন্তু শিল্পীসত্তা দমাতে পারেনি এই তরুণীকে। এই কঠিন সময়গুলোই তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
​তিনি বলেন, “মঞ্চে বসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও গান গাইতে না পারার যন্ত্রণা আমাকে অনেক রাত কাঁদানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমি মনে করেছি, আমার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হলে আমাকে আরও সাধনা করতে হবে। সেই সব দিনগুলোই আমাকে আজকের এই দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে এসেছে।”
​গুরুর সান্নিধ্য ও শিক্ষা
টুকটুকির সংগীত সাধনার পথে প্রথম গুরু ছিলেন নিজামুদ্দিন লালনী। বর্তমানে তিনি সংগীতের তালিম নিচ্ছেন বিশিষ্ট সংগীত গুরু কাজী দলিলুদ্দীনের কাছ থেকে।
​গুরু কাজী দলিলুদ্দীন তার শিষ্যা সম্পর্কে বলেন, “টুকটুকির কণ্ঠের মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত মায়া ও আধ্যাত্মিকতা আছে। তবে শুধু কণ্ঠই নয়, তার মধ্যে যা আছে তা হলো ‘ধৈর্য’। বাউল সাধনায় ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। সে যে প্রতিকূলতা পার করে আজ উঠে এসেছে, তা দেখে আমি মুগ্ধ। সে যদি নিয়মিত এভাবে সাধনা চালিয়ে যেতে পারে, তবে বাউল গানের জগতে সে অনেক দূর যাবে বলে আমার বিশ্বাস।”
​বাবার স্মৃতিচারণ করে বাবা মো. টোকোন সিকদার বলেন, “আমার মেয়ে যখন ছোট, তখন থেকেই তার গলার আওয়াজ ছিল আলাদা। সে অনেক অবহেলা আর কষ্টের মধ্য দিয়ে আজকের এই জায়গায় এসেছে। আমার স্বপ্ন ছিল সে মানুষের শিল্পী হবে, আজ লাখো মানুষ তাকে চেনে, ভালোবাসে—এটাই আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি।”
​পড়াশোনার পাশাপাশি গানের চর্চায় নিজেকে যেভাবে নিয়োজিত রেখেছেন টুকটুকি, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। টুকটুকি ২০২৫ সালে ফরিদপুর ইয়াসিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। তার কণ্ঠে লোকসংগীতের প্রতিটি কলি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নিয়মিত পরিবেশনাগুলো মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়, যা প্রমাণ করে বাংলা মাটির গানের আবেদন আজও কতটা অটুট।
​নতুন এই প্রতিভাবান বাউল শিল্পীর আগামী দিনের পথচলা আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক, ফরিদপুরসহ দেশবাসীর এটাই প্রত্যাশা।