ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৪৭:০০ AM

২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার তিন পাজেরো উদাও

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
04-08-2026 07:42:15 PM
২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার তিন পাজেরো উদাও

নরসিংদীর ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং (আধুনিকায়ন) প্রকল্পে কেনা তিনটি বিলাসবহুল পাজেরো জিপের কোনো সন্ধান মেলেনি। প্রকল্পের অর্থে কেনা এসব গাড়ির জন্য ব্যয় হয়েছিল ২ কোটি ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৮০ টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং সরকারি অডিট প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্প এলাকা কিংবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়—কোথাও গাড়িগুলোর অবস্থান জানা যায়নি। এগুলো কারা ব্যবহার করছেন, সে বিষয়েও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) অধীনে বাস্তবায়িত প্রকল্পে মোট ২৪টি যানবাহন কেনা হলেও প্রকল্প শেষের পথে থাকলেও সেগুলো সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্পে বরাদ্দের বাইরে অর্থ ব্যয়, অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত কাজের বিল, পরামর্শকদের বিশেষ সুবিধা, বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং কারিগরি বিপর্যয়সহ নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে।

অডিট অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রকল্পে মোট ১৪টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি নিষ্পত্তি হয়েছে, বাকি ১৩টি এখনো অমীমাংসিত। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুমোদন ছাড়া ১৫ কোটি ৮৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি মূল চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ৩৬ কোটি ১৫ লাখ ২৫ হাজার টাকার কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির বিষয়েও গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। আরডিপিপিতে ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা লোন ফির সংস্থান থাকলেও তার বাইরে এইচএসবিসি ব্যাংককে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৬ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া লোন ফির ওপর নির্ধারিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে ৫ শতাংশ কাটা হওয়ায় সরকারের প্রায় ৩৫ কোটি ২৯ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। বিদেশি পরামর্শকদের আয়কর কম কেটে আরও ৫৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। সরকারি অর্থে পরামর্শকের বাসার ১ লাখ ৫ হাজার টাকার খাবারের বিল এবং ৬৩ লাখ ১১ হাজার টাকার বিধিবহির্ভূত ছুটি নগদায়নের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিটের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে চালু হলে রাষ্ট্র প্রতিবছর ১১৫ কোটি ৮৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা আর্থিক সুবিধা পেত। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে কয়েক বছর ধরে এই সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার, যার ফলে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে একাধিকবার সময় বাড়িয়ে বর্তমান মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। এতে প্রকল্পের সময়সীমা মূল পরিকল্পনার তুলনায় ২৯০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যয়ও প্রায় ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা থেকে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৯ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।

প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৭ শতাংশ দাবি করা হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে গ্যাস টারবাইন আংশিক উৎপাদনে এলেও ২০২১ সালের ১৬ জুলাই যান্ত্রিক দুর্ঘটনায় কম্প্রেসরের একাধিক ব্লেড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছরেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা যায়নি।

ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য জিই সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি হলেও একটি পুরোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধের কারণে সুইজারল্যান্ডের আদালত যন্ত্রাংশের ওপর বাজেয়াপ্ত আদেশ জারি করায় মেরামত বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৬ জুন আদালত সেই আদেশ প্রত্যাহার করলে যন্ত্রাংশ ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায় এবং ১৮ মে থেকে মেরামত শুরু হয়। কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, গ্যাস টারবাইন চালু করে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কম্বাইন্ড সাইকেল উৎপাদনে যাওয়া।

প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও অস্থিরতা ছিল প্রকট। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নয়বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। অনুমোদিত ৩০টি পদের মধ্যে বর্তমানে ১০টি শূন্য রয়েছে, ফলে তদারকি ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির নির্ধারিত ৪০টি বৈঠকের বিপরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ১২টি এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির ৪০টির মধ্যে হয়েছে মাত্র ১৫টি সভা।

আইএমইডি আরও জানিয়েছে, প্রকল্প সচল থাকাকালেও গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হয়নি। ২ বছর ৭ মাস সচল থাকলেও এর মধ্যে প্রায় ১৫ মাস গ্যাসের অভাবে ইউনিট বন্ধ ছিল। এছাড়া ১৯৮৬ সালের পুরোনো ২১০ মেগাওয়াট ইউনিটের স্টিম টারবাইন ও জেনারেটর সংস্কার করে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে ব্যবহার করায় ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে ভবিষ্যৎ পরিচালনার জন্য কোনো এক্সিট প্ল্যান রাখা হয়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়েও ইউনিটটির প্রকৃত কারিগরি ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। আইএমইডি সুপারিশ করেছে, জাতীয় গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের প্রকল্পেই পদায়ন করা এবং অমীমাংসিত ১৩টি অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিখোঁজ তিনটি পাজেরো জিপের অবস্থান শনাক্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।