ঢাকা, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১০:২১:৫৩ PM

গ্যাস সংকটে নিত্যদিনের যুদ্ধ নারীদের

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
08-02-2026 08:55:17 PM
গ্যাস সংকটে নিত্যদিনের যুদ্ধ নারীদের

সকাল ছয়টা। রান্নাঘরের চুলায় হাঁড়ি বসানো হলেও আগুন জ্বালাতে পারছেন না রুবিনা আক্তার। গ্যাস নেই। মিরপুরের এই গৃহিণীর দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তানের নাশতা বানাতে প্রতিদিন ভোরে উঠলেও গ্যাস না থাকায় অনেক দিনই ঠিকমতো খাবার দিতে পারেন না।“চুলায় কখন গ্যাস আসবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার আগে খাওয়াতে পারি না। শেষ পর্যন্ত শুকনো খাবার দিয়েই পাঠাতে হয়,” বলেন রুবিনা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বাসাবাড়ির গ্যাস সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে নারীদের ওপর। রান্না, পরিবারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং সময় পরিকল্পনার দায়িত্ব যাদের কাঁধে—গ্যাস সংকটে তারাই পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শাহানাজ বেগম তিন বেলা রান্নার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
“সকালবেলা যদি সামান্য গ্যাস আসে, তখন দুপুর আর রাতের রান্না একসঙ্গে করে ফেলি। না হলে সারাদিন টেনশনে থাকতে হয়। রান্নাঘরেই পড়ে থাকতে হয়,” বলেন তিনি।

বিকল্প হিসেবে শাহানাজ ইলেকট্রিক রাইস কুকার ও ইন্ডাকশন ব্যবহার করছেন। কিন্তু এতে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিল।
“গ্যাসের বিল আগের মতোই দিতে হয়, আবার বিদ্যুৎ বিলও বাড়ছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে,” যোগ করেন তিনি।

কর্মজীবী নারীদের দ্বিগুণ চাপ

গ্যাস সংকট কর্মজীবী নারীদের দৈনন্দিন রুটিনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কুড়িল এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকা নাসরিন সুলতানা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তার অফিস শেষে বাসায় ফিরে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

“অফিস থেকে ফিরে দেখি গ্যাস নেই। তখন বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়। এতে খরচ বাড়ে, আবার স্বাস্থ্য নিয়েও দুশ্চিন্তা থাকে,” বলেন নাসরিন।

তিনি মনে করেন, পরিবারে রান্নার দায়িত্ব এখনো মূলত নারীর ওপরই বর্তায়।
“গ্যাস না থাকলে সেই দায় নারীর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। অফিসের কাজ শেষ করেও রান্না নিয়ে দুশ্চিন্তা মাথা থেকে যায় না,” বলেন তিনি।

পরিসংখ্যান কী বলছে

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ)। তবে বাস্তবে গড়ে উৎপাদন ও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২,৭০০ এমএমসিএফ। ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১,১২৩ এমএমসিএফ

এই ঘাটতির বড় অংশের প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়ির গ্যাস লাইনে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) রফিকুল ইসলাম জানান, মোট গ্যাস সরবরাহের মাত্র ১১ থেকে ১২ শতাংশ যায় গৃহস্থালি খাতে।

“শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে আবাসিক গ্রাহকদের লাইনে চাপ পড়ে,” বলেন তিনি।

সংকটের কারণ ও বাস্তবতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসা, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ধীরগতি এবং আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে সরবরাহ বাড়ানোও সহজ নয়।

ঢাকার অনেক এলাকায় দিনে কয়েক ঘণ্টা বা গভীর রাতে গ্যাস আসে। এতে নিয়মিত রান্না প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার একসঙ্গে কয়েক দিনের রান্না করে সংরক্ষণ করছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন।

নারীর অদৃশ্য শ্রম ও নীতিগত উদাসীনতা

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, গ্যাস সংকট শুধু জ্বালানি সমস্যা নয়—এটি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের একটি অদৃশ্য দিকও উন্মোচন করছে। রান্না ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সামাজিক বাস্তবতা সংকটে তাদের ভোগান্তিকে দ্বিগুণ করে তুলছে।

তাদের মতে, জ্বালানি নীতিনির্ধারণে গৃহস্থালি খাত ও নারীর শ্রমের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সমাধানের দাবি

ভুক্তভোগী নারীরা দ্রুত ও কার্যকর সমাধান চান। নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ, বিকল্প জ্বালানিতে ভর্তুকি এবং বিল পুনর্বিবেচনার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

রুবিনা আক্তারের মতো গৃহিণীদের প্রশ্ন—
“আমরা নিয়মিত বিল দিই, তবু গ্যাস পাই না। এই অনিশ্চয়তা আর কত দিন চলবে?”

গ্যাস সংকটের এই বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—জ্বালানি ঘাটতির বোঝা কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিন হাজারো নারীর জীবনে বাড়তি চাপ, মানসিক ক্লান্তি ও নীরব সংগ্রামের গল্প হয়ে উঠছে।