ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:০২:৪৪ PM

অভিযোগের পরও বহাল সিডিএ প্রকৌশলী

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
21-07-2026 03:26:13 PM
অভিযোগের পরও বহাল সিডিএ প্রকৌশলী

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর বিগত ১৬ বছরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা, বিভাগীয় তদন্ত এবং দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালনকারী কিছু প্রকৌশলীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করায় একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় গড়ে উঠেছে, যা পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন শামস। ২০০৮ সালে নগরীর অক্সিজেন-কাপ্তাই সংযোগ সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুদকের একটি মামলার সঙ্গে তার নাম জড়ায়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তিনি তদারকিতে ব্যর্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩ লাখ টাকা জমা দেন এবং তৎকালীন সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনের কাছে অনুকম্পা প্রার্থনা করেন। পরে কমিশন তার আবেদন গ্রহণ করে। বর্তমানে তিনি সিডিএতে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.এ.এম. হাবিবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাং মনজুর হাসান, মো. আশরাফুল ইসলাম, আহম্মদ মঈনুদ্দিন, মো. মাহফুজুর রহমান, রাজীব দাশ, অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ হাসান, সহকারী প্রকৌশলী আ হ ম মিছবাহ উদ্দিন, মুহাম্মদ ইলিয়াছ আকতার, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ওসমান সিকদার, মুহাম্মদ হামিদুল হক, মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং এস্টিমেটর রুপন কুমার চৌধুরী ও সৈয়দ গোলাম সরোয়ার।

সিডিএর সংস্থাপন শাখার তথ্য অনুযায়ী, উপসহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক, এস্টিমেটর সৈয়দ গোলাম সরোয়ার এবং উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। তবে পরে সেই কার্যক্রম স্থগিত হয়। কেন তা স্থগিত হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সিডিএর বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দীর্ঘ সময়েও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম কমিটি প্রায় সাত মাসেও কোনো বৈঠক করতে পারেনি। পরে গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রণালয় নতুন করে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করে।

নতুন কমিটির আহ্বায়ক করা হয় উন্নয়ন অনুবিভাগ-১-এর অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনকে এবং সদস্যসচিব করা হয় সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমাকে। কমিটিতে আরও রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইদ মাহবুব মোরশেদ, উপসচিব মো. নাজমুল আলম, স্থপতি সৈয়দা জারিনা হোসাইন ও সৈয়দ কুদরত আলী। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, বিগত সময়ে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম ও অভিযোগ যাচাই করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। এ বিষয়ে সিডিএ সচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব রবীন্দ্র চাকমা বলেন, কমিটি গঠনের পর আহ্বায়ক অন্যত্র বদলি হওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। নতুন আহ্বায়ক নিয়োগের পর তদন্ত শুরু হবে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, তদন্ত কমিটির সদস্য এবং মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, তদন্তের পরিধি বড় হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বিগত সময়ে কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং বর্তমানে বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সিডিএর একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সিডিএ আগের তুলনায় অনেক বেশি জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মনোযোগী এবং ভবিষ্যতে এর ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান হবে।"

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত বদলি ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন তারা।

চট্টগ্রামের নাগরিকদের প্রত্যাশা, সিডিএকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রতিষ্ঠানটি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে— এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।