ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১০:৪৯:১৫ PM

মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়ে ঘুষের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
03-07-2026 09:27:52 PM
মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়ে ঘুষের অভিযোগ

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে ঘিরে ঘুষ, অনিয়ম ও বৈষম্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের বকেয়া ভাতা পরিশোধের নামে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ এনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা। অভিযোগে ট্রাস্টের তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, ভাতা প্রদানে বৈষম্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাহবুবুর রহমান, যুগ্ম পরিচালক (প্রশাসন) মো. ফয়েজ আহমেদ খান এবং সহকারী প্রধান হিসাব নিরীক্ষক আবুল হোসেন গাজীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনজন মুক্তিযোদ্ধা এবং এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মধ্যস্থতাকারী বা দালাল হিসেবে ব্যবহার করে বকেয়া ভাতা প্রদানের বিপরীতে ঘুষ আদায় করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, যেসব মুক্তিযোদ্ধা ঘুষ দিতে রাজি হয়েছেন, তাদের বকেয়া ভাতা সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়েছে। আর যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের প্রাপ্য অর্থ থেকে সাড়ে তিন লাখ বা তিন লাখ টাকা কেটে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে উল্টো মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ‘ডি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত গেজেট বাতিল করে দেওয়ার এবং মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর উচ্চ আদালতের একাধিক রিট পিটিশনের রায়ে গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ডি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২০০৩ সাল থেকে প্রাপ্য সব ধরনের বকেয়া ভাতা পরিশোধের নির্দেশও দেওয়া হয়। আদালতের সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের সুযোগকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি ঘুষনির্ভর সিন্ডিকেট।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, এ সিন্ডিকেটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন তিন মুক্তিযোদ্ধা—মো. তাহাজ উদ্দিন, মো. নুরুল হুদা ও মো. মাহবুবুর রহমান এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ইফতেখার আহমেদ সবুজ। অভিযোগ অনুযায়ী, বকেয়া ভাতার নথি ছাড় করার আগে প্রত্যেকের কাছ থেকে অগ্রিম সাড়ে তিন লাখ টাকার চেক নেওয়া হতো। যেসব মুক্তিযোদ্ধা এই চেক দিয়েছেন, তাদের ব্যাংক হিসাবে চলতি বছরের ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ১৯০ টাকা জমা হয়। একই সময়ে অগ্রিম নেওয়া চেক নগদায়নের মাধ্যমে ঘুষের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রায় একশ জন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে এভাবে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ আদায় করা হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব মুক্তিযোদ্ধা ঘুষ দিতে রাজি হননি, তাদের বকেয়া ভাতা থেকে সরাসরি তিন লাখ বা সাড়ে তিন লাখ টাকা কম দেওয়া হয়েছে। গত মার্চ মাসের ২ ও ৩ তারিখে প্রায় ৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধার হিসাবে ভাতার অর্থ জমা হলেও অধিকাংশই পূর্ণ অর্থ পাননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একই আদালতের রায় এবং একই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও ভাতার পরিমাণে অস্বাভাবিক বৈষম্য দেখা গেছে। কেউ পূর্ণ ১৪ লাখ ২৯ হাজার ১৯০ টাকা পেয়েছেন, আবার কেউ পেয়েছেন ১০ লাখ ৭৯ হাজার ১৯০ টাকা কিংবা ১১ লাখ ২৯ হাজার ১৯০ টাকা। অর্থাৎ, কারও কাছ থেকে তিন লাখ এবং কারও কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা কম দেওয়া হয়েছে। কেন এই অর্থ কেটে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে ভুক্তভোগীরা ট্রাস্টের যুগ্ম পরিচালক (প্রশাসন) মো. ফয়েজ আহমেদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি তাদের দালাল হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে সহকারী প্রধান হিসাব নিরীক্ষক আবুল হোসেন গাজীর কাছেও গেলে তিনিও একই পরামর্শ দেন। সর্বশেষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও অভিযোগকারীরা একই ধরনের উত্তর পান বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরাই বিষয়টি অনুসন্ধান করেন। তাদের দাবি, অনুসন্ধানে ট্রাস্টের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং মধ্যস্থতাকারীদের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ণ অর্থ দেওয়া হলেও অন্যদের প্রাপ্য অর্থ সরকারি তহবিলে আটকে রাখা হয়েছে অথবা কেটে রাখা হয়েছে। আর যাদের পূর্ণ অর্থ দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছ থেকেও অগ্রিম চেকের মাধ্যমে ঘুষের অর্থ আদায় করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভাতা নিয়ে বৈষম্যের প্রতিবাদ করায় তাদের চরম অপমান ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রাপ্য অর্থ কম পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে আপনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিই প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়া হবে’—এমন হুমকি দেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এ ধরনের আচরণে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, যেসব ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অগ্রিম চেক দিয়েছেন, তাদের নথি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, সৎ ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তারা এ ঘটনাকে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও ঘুষ কেলেঙ্কারি হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে দায়ের করা লিখিত অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, কেটে রাখা বকেয়া ভাতার অর্থ দ্রুত পরিশোধ এবং পুরো ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ অভিযোগকারীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা হবে।