জনগণের করের অর্থে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি হাসপাতাল নির্মাণ, ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটাকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন ভবন নির্মাণ এবং ভারী চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে জাতীয় কিডনি হাসপাতালের জন্য ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. রাশেদ আনোয়ারের ওপর চাপ প্রয়োগের কথাও বলা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে স্বাস্থ্য খাতে অতীতে আলোচিত দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত মিঠু নামের এক ব্যক্তির পুনরায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, সংশ্লিষ্ট একটি চক্র সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য জানা জরুরি এবং তা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
অভিযোগের আরও একটি অংশে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুজ্জামানকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুলের বাসভবনে ডেকে নেওয়া হয় এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তবে এ ঘটনারও স্বাধীন কোনো প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির অভিযোগ শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ের প্রশ্ন নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায়। নিম্নমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হলে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একইভাবে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।
এ ছাড়া বিনামূল্যে স্বাস্থ্যকার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক সুযোগ নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রকল্প, ভবন ও যন্ত্রপাতি কেনাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, দরপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা এবং যন্ত্রপাতির মান যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত করে প্রকৃত অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনগণের অর্থে পরিচালিত স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি বা অনিয়মের কোনো অভিযোগই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।