রাজধানীর নিউমার্কেটে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই শুটারসহ কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের অনুসারী কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে নিউমার্কেট থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটি কার্যত অগ্রগতিহীন অবস্থায় রয়েছে। ঢাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফের অস্থিরতার কথা বলছেন কেউ কেউ। ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা বলছে, তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথি বিশ্লেষণ করে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করতে আরও সময় লাগবে।তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন টিটন মোবাইল ফোন সঙ্গে না নেওয়ায় তার অবস্থান ও কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল— তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডিবির একটি সূত্র জানায়, পূর্বপরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ডে টিটনকে নিউমার্কেট এলাকায় ডেকে আনা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, তার ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তি তাকে সেখানে যেতে প্ররোচিত করে, যাতে হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জ এলাকার বাসায় ফেরার পথে নিউমার্কেট এলাকা দিয়ে যাতায়াত নিশ্চিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ তৈরি করতেই এই স্থান বেছে নেওয়া হয় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।পুলিশের ধারণা, মাত্র ৪ মিনিটের মধ্যে সংঘটিত এই ‘কিলিং মিশন’-এ পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় এবং এরপরই হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পুরো ঘটনায় ঢাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পুরো সময়রেখা উদ্ধার করেছে তদন্তকারীরা। এতে দেখা যায়, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীর নিউমার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকায় ঘুরছিল দুই মোটরসাইকেল আরোহী শুটার।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সন্ধ্যা ৬টা থেকেই ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান নেয় তারা। পরে রাত ৭টা ৫০ মিনিটে নীলক্ষেত মোড়ে তাদের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করা হয়। একই সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনও।এরপর টিটন হেঁটে ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হলে, মোটরসাইকেলে থাকা দুই শুটার তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে, রাত ৭টা ৫৪ মিনিটে তারা টিটনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় একে একে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় তাকে লক্ষ্য করে।
হামলার পরপরই শুটাররা দ্রুত মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তারা বিজিবি গেটের সামনে দিয়ে ইরানি মাঠের পাশ হয়ে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে উঠে যায়। সেখান থেকে দ্রুত গতিতে কেরানীগঞ্জের আঁটিবাজারের দিকে পালিয়ে যায় বলে সিসি ফুটেজে দেখা গেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, পুরো ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং হামলাকারীরা নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করে খুব দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।সন্দেহে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম
টিটন হত্যার পেছনের কারণ নিয়ে তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, ঢাকার অপরাধ জগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী—‘সিটি অব গড’ খ্যাত ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং সানজিদুল ইসলাম ইমন।জানা যায়, নিহত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনসহ সন্দেহভাজন এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুর এলাকায় একসঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন। পরে অপরাধ জগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, নিহত নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে সন্দেহের তালিকায় থাকা দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। বিশেষ করে সানজিদুল ইসলামের সঙ্গে তার অস্ত্র ব্যবসা ও ঢাকার অপরাধ জগতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টানাপোড়েন চলছিল বলে জানা গেছে।অন্যদিকে, সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েও টিটনের সঙ্গে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের বিরোধ তৈরি হয়। এ ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর যে কোনো একটি পক্ষই পূর্বশত্রুতার জেরে টিটনকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
এদিকে নিহত টিটনের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন। তবে মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি। এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলালসহ তার তিন সহযোগী— বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান এবং রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর দাবি, বছিলার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েই মূলত টিটনের সঙ্গে তাদের বিরোধ চলছিল
মোবাইলের অ্যাপসে যোগাযোগ করতো টিটন
টিটন হত্যা মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন জানিয়েছেন, ঘটনার এক সপ্তাহ আগেও ছোট ভাই খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে তার যোগাযোগ হয়েছিল।
তিনি বলেন, টিটন দীর্ঘদিন কারাবাসে ছিল। একই সময়ে সে নিজে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছিল। ২০১৮ সালে দেশে ফেরে সে। তখনো টিটন কারাগারে ছিল।
রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকের কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পায় টিটন। মুক্তির পর থেকেই সে আত্মগোপনে ছিল এবং স্বাভাবিক মোবাইল ফোনে যোগাযোগ না করে অ্যাপসের মাধ্যমেই সীমিত যোগাযোগ রাখত। ঘটনার আগে নিয়মিত ফোনে নয়, অ্যাপসে কথা হতো।
হুমকিতে থাকার কথা আগেই জানিয়েছিলেন টিটন
রিপন বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত টিটন গত রমজানের ঈদে যশোর কোতোয়ালি এলাকার নিজ বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সেটিই ছিল তার শেষ বাড়ি ফেরা। এরপর থেকে আর বাড়িতে যায়নি।
রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন থেকেই টিটন বিভিন্ন ঝামেলা ও হুমকির মধ্যে ছিল বলে জানিয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহেও চলমান ঝামেলায় থাকার কথা জানিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, গত ২৭ এপ্রিল টিটন ফোন করে প্রতিপক্ষ তাকে আলোচনার জন্য ডেকেছে এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছিল। ওই সময় টিটন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, গরুর হাটের ইজারার কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই হুমকি-ধামকির মধ্যে ছিল। তবে পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানায়। রিপনের মতে, টিটন বলেছিল—‘ঝামেলা মিটে গেছে, আমরা একসঙ্গেই কাজ করবো, ওরা বসতে চায়, মীমাংসা হয়ে যাচ্ছে।’
পরদিন ২৮ এপ্রিল রাতে জানতে পারি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রাতেই ঢাকা আসি। ২৯ এপ্রিল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে ছোট ভাইয়ের মরদেহ শনাক্তের পর গ্রামের বাড়ি নিয়ে দাফন সম্পন্ন করি।
ভগ্নিপতি ইমনই খুন করেছে টিটনকে, দাবি পিচ্চি হেলালের
গণমাধ্যমে দেওয়া এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল টিটন হত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এ বিষয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তিনি দাবি করেন, গত এক মাসের মধ্যে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে কথা বলতে একটি শব্দও উচ্চারণ হয়নি।
পিচ্চি হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহলে টিটনের শত্রু কে? টিটনই বলে গেছে যে ইমন ওকে মারতে চায়। পারিবারিকভাবে ওর সমস্যা আছে। টিটনের নিজের পরিবারের মধ্যেই বিরোধ ছিল। তার বোন ও বোন জামাইয়ের (ইমন) সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। তারা দুজনই চেয়েছিল টিটন মারা যাক। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।
পিচ্চি হেলাল তার বক্তব্যে আরও বলেন, এখন প্রযুক্তির যুগে সব কিছুই যাচাই করা সম্ভব। তার দাবি অনুযায়ী, এজাহারে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে— হাটের ইজারা বা পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে টিটনের দ্বন্দ্ব ছিল— তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। টিটন ও তার ভাই রিপনের ফোন ফরেনসিক করলে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের কথোপকথন হয়নি।