শেষ পর্ব : অন্ধকারের উত্তরাধিকার
পৃথিবীতে রয়ে গেছে একজন অন্ধ বাবা।যার চোখে আলো নেই, যার জীবনে আর কোনো ভরসাও নেই।
যে ছেলেটা ছিল তার শেষ সম্বল—বাকহারা, নিরীহ, নীরব—সেই সন্তানটাকেও মানুষ নামের মানুষেরা মেরে ফেলেছে। ভ্যান নিয়ে গেছে। স্বপ্ন নিয়ে গেছে। জীবনের শেষ আলোটুকুও নিভিয়ে দিয়েছে।
এখন পারভেজের বাবার জীবন পুরোপুরি অন্ধকার।
আগে তিনি চোখে দেখতেন না,
এখন তিনি বাঁচতেও দেখেন না।
ছেলে বেঁচে থাকতে তিনি জানতেন—চোখে আলো না থাকলেও তার হাতে একটা হাত আছে। সেই হাতটা তাকে রাস্তা পার করায়, ভিক্ষার লজ্জা থেকে বাঁচায়, মানুষ হিসেবে মাথা তুলে বাঁচতে শেখায়।
আজ সেই হাত নেই।
ভোর হলে তিনি জেগে ওঠেন। অভ্যাসের বশে দরজার দিকে তাকান—যেন ভ্যানের শব্দ আসবে। তারপর মনে পড়ে—ভ্যান নেই, পারভেজ নেই। তখন বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। তিনি চুপ করে বসে থাকেন। দেয়ালে হাত বুলান। ছেলের জায়গাটা খোঁজেন।
পান না।
ঘরের ভেতর এখন শব্দ নেই। আগে পারভেজ কথা বলত না—তবু ঘরে প্রাণ ছিল। এখন সবাই কথা বলতে পারে, তবু ঘরটা মৃত।
পারভেজের মা মাঝে মাঝে হাঁড়ির ঢাকনা খুলে তাকিয়ে থাকেন। ভাত কম। ডাল নেই। চোখে জল আসে। তিনি শব্দ করে কাঁদেন না। শব্দে কাঁদলে প্রতিবেশীরা শুনবে। শুনলে প্রশ্ন করবে। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার শক্তি তার নেই।
একটা সন্তান হারানোর পর মানুষ শুধু কাঁদে না—মানুষ ভেঙে পড়ে।
এই পরিবারটা ভেঙে গেছে।
অন্ধ বাবা আবার ভিক্ষার থালা হাতে নিয়েছেন। কিন্তু এই থালাটা আগের মতো নয়। এই থালার প্রতিটা টাকায় লেগে থাকে অপমান নয়—লেগে থাকে রক্তের গন্ধ। কেউ টাকা দিলে তিনি মাথা নত করেন। কেউ না দিলে তিনি কিছু বলেন না। আগে পারভেজ থাকলে সে বুঝিয়ে দিত—চলো, অন্যদিকে যাই।
এখন কেউ নেই।
একদিন তিনি ধীরে করে বলেছিলেন,
“ও যদি কথা বলতে পারত, হয়তো বাঁচত।”
এই কথাটা শুনে যারা পাশে ছিল, তারা মুখ নিচু করে ফেলেছিল। কারণ কথাটা সত্য—এই সমাজে নীরব মানুষের বাঁচা কঠিন।
নাজুর জীবনও বদলে গেছে।
সে হারিয়েছে অজানা ভালোবাসার মানুষটিকে। ভালোবাসাটা কোনোদিন নাম পায়নি। কেউ জানতও না। কিন্তু ভালোবাসা নাম না পেলেও ব্যথা ঠিকই পায়।
নাজু এখন আগের মতো হাসে না। সে কথা কম বলে। নামাজ শেষে সে আর স্বপ্ন দেখে না। শুধু চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হয়—যদি পারভেজ কথা বলতে পারত, যদি সে জোরে চিৎকার করতে পারত—তাহলে কি সে বেঁচে যেত?
এই প্রশ্ন তাকে ঘুমাতে দেয় না।
সে জানে—পারভেজ কারও শত্রু ছিল না। কোনো অপরাধ করেনি। সে শুধু কাজ করে বাঁচতে চেয়েছিল। একটা সামান্য ভ্যান—সেটাই ছিল তার পৃথিবী।
আর সেই পৃথিবীর জন্যই তাকে মরতে হয়েছে।
ভ্যানটা আর পাওয়া যায়নি। মানুষটা হারিয়ে গেছে। সমাজ যন্ত্রটাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ এই সমাজে যন্ত্রের দাম আছে, মানুষের নয়—বিশেষ করে যদি সে প্রতিবন্ধী হয়।
কয়েকদিন হৈচৈ হয়েছিল। পুলিশ এসেছিল। লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল—কে মারল? কেন মারল? তারপর ধীরে ধীরে সব চুপ হয়ে গেছে।
কারণ পারভেজ ছিল বোবা।
কারণ পারভেজ ছিল গরিব।
কারণ পারভেজ ছিল প্রতিবন্ধী।
এই তিনটা পরিচয় একসাথে থাকলে বিচার অনেক সময় প্রয়োজন পড়ে না—ভুলে যাওয়াই নিয়ম হয়ে যায়।
সময় এগিয়ে গেছে। গ্রামে নতুন ভ্যান এসেছে। নতুন চালক। বাজার বসে। মানুষ হাসে। জীবন থেমে থাকে না।
শুধু পারভেজের জীবনটাই থেমে গেছে।
অন্ধ বাবা একদিন উঠোনে বসে বলছিলেন,
“ওর চোখ ছিল আমার চোখ। ওর হাত ছিল আমার পথ।”
কেউ উত্তর দেয়নি।
কারণ উত্তর দেওয়ার মতো মানুষ খুব কম।
এই গল্পে কোনো নায়ক নেই। কোনো জয়ের গল্প নেই। এখানে আছে শুধু হারানোর ইতিহাস। এখানে আছে মানুষের মুখোশের ভেতরের অমানবিক চেহারা।
পারভেজ কথা বলতে পারেনি। তাই তার জীবনের কষ্ট কেউ শোনেনি। মৃত্যুর পরও তার পক্ষে কেউ জোরে কথা বলেনি।
সে শুধু একটাই কথা প্রমাণ করে গেছে—
এই সমাজে প্রতিবন্ধী হওয়াটা শুধু দুর্বলতা নয়, অনেক সময় মৃত্যুদণ্ড।
আজ পারভেজ নেই।
ভ্যান নেই।
একটা পরিবার নিঃস্ব।
একটা মেয়ে শূন্য।
একজন অন্ধ বাবা সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
আর বাতাসে ভাসছে একটা প্রশ্ন—
আমরা কি মানুষ?
না কি মানুষ নামের অমানুষ?
এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না।
কারণ উত্তরটা খুব কঠিন।
এই উপন্যাস এখানেই শেষ হয়।
কিন্তু বাস্তবতা এখানেই শেষ নয়।
পারভেজরা আজও মরে—
নীরবে,
অবহেলায়,
মানুষের হাতে।
শেষ.............